পাহাড়ের পাদদেশে প্রকৃতির কন্যার মুগ্ধকর সৌন্দর্য

প্রকাশিত: ৬:৪১ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৫, ২০২৩

পাহাড়ের পাদদেশে প্রকৃতির কন্যার মুগ্ধকর সৌন্দর্য

তাসলিমা খানম বীথি: প্রকৃতি কন্যাকে দেখতে যাবো। সেই আনন্দে ভোরের আলো ফুটতেই ঘুম থেকে ওঠি। রাফার সাথে আগে কথা হয়। তাই ঝটপট রেডি হয়ে রাফাকে কল দেই। সেও রেডি হচ্ছে। আমি আগেই বের হয়ে যাই। রাফা দেরি দেখে আম্বরখানা পয়েন্টে এসে সিরাজী রেস্টুরেন্টে বসে গরম পরটা দিয়ে চা খাই। কিছুক্ষণ পর রাফার রিকশা দেখতে পাই। দুজনে রিকশা বসে শীতের সকালকে সেলফি তুলে ফেসবুকে জানান দেই-শুভ সকাল। অনেকদিন পর ভ্রমনে যাচ্ছি ফুরফুরে মনে দুজনে কথা বলছি। হঠাৎ রিকশা থেমে যায়। কি হলো? চৌহাট্টা পয়েন্টে দুজনকে আটকে দিলো। সকাল ১০টা হয়নি এখনো তাহলে রিকশা যাবে না কেন দুজনের প্রশ্ন। ট্রাফিক দায়িত্বে থাকা তারা বলে এখন সময় শেষ আর হবে না। আমরা বলি বন্দর পয়েন্ট সামনেই তাছাড়া সকাল সোয়া ৯টা বাজে আমাদের রিকশা যাবে বলে দুজেন জীদ করি। যানজট এড়াতে সকাল ১০টা হলে রিকশা চলাচল বন্ধ রাখে তারা। আমরা কিছু বলার আগেই জানতে চাইলেন- আপনারা কী সাংবাদিক? দুজনে হ্যা বলি-তাহলে প্রেসকার্ড দেখান। ব্যাগ চেঞ্জ করে ছোট ব্যাগ নেওয়াতে প্রেস আইডি কার্ড নিতে ভুলে যাই। রাফা আইডি কার্ড বের করে দিতে রিকশা ছেড়ে দেয়। এরকম মুহুর্ত জন্য আমরা প্রস্তুত ছিলাম না। যাই হোক। সাংবাদিকতা জীবনে এরকম ছোটখাটো প্রায়ই সময় ফেস করছি। কখনো মিছিলে সামনে, কখনো হরতাল অবরোধে। সিলেটের বন্দও পয়েন্টে মধুবন মার্কেটের সামনে রিকশা থেকে নেমে দেখি ভ্রমন যাত্রী অনেকে চলে আসছে। বাকীরা আসতে দেরি দেখে আমি রাফা আর সাংবাদিক ফারহানা আপা চায়ে চুমুক দেই।
২. শনিবার ১৪ জানুয়ারি। ডিজিটাল সাংবাদিকতার স্মারক প্রতিষ্ঠান সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাবের বার্ষিক বনভোজন গোয়াইনঘাট উপজেলায় অবস্থিত প্রকৃতিকন্যা জাফলংয়ে উদ্দেশে সকাল সাড়ে ১০টা বাস গন্তব্যের পথে যেতে শুরু করে।
অনলাইন প্রেসক্লাবের প্রত্যেক সদস্য যে যার মত করে বসে পড়ে বাসে। সিনিয়র সাংবাদিকরা সামনের সারিতে আর আমরা জুনিয়রা মাঝখানের সিটে। অনলাইন প্রেসক্লাবের বনভোজনকে নিয়ে লাইভে সবার উচ্ছাসিত অনুভুতি আপডেট প্রচার করেন কোষাধ্যক্ষ আব্দুল মুহিত দিদার। ব্যস জমে গেলো আমাদের ভ্রমন যাত্রা।
তরুণ সাংবাদিক ইফতেখার শামীম আর আবীর গলায় গানের সুরে ভেজে ওঠে-
তুমি বন্ধু কালা পাখি
আমি যেন কি
বসন্ত কালে তোমায়
বলতে পারিনি।
সাদা সাদা কালা কালা
রং জমেছে সাদা কালা।
এরকম চমৎকার গানে আড্ডায় মুখরিত আমাদের মন মননে। ভ্রমন যাত্রার শুরুতেই সবাইকে সকালের মজাদার নাস্তা প্যাকেট দেওয়া হয়। শাহপরাণ মাজার পাড়ি দিয়ে ছোট্ট একটি চা বিরতি তারপর সাংবাদিক আলমগীর ও এম হান্নান, শামীম, আবীর যৌথ কন্ঠে গান-
ভালো আছি ভালো থেকো
আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো।
গান গেয়ে আমার মনরে বুঝাইৃ
গানের হৈ-চৈ হুল্লোর মধ্যে সাংবাদিক ওয়াহিদ ভাই গভীর ঘুমে ডুবে আছেন। জম্পেস গানের তালে বাস চলে আসে প্রকৃতির কন্যার কাছে।
৩. সিলেটে সবার কাছে প্রকৃতি কন্যা নামে পরিচিত জাফলং। খাসিয়া জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত জাফলং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি। পিয়াইন নদীর তীরে স্তরে স্তরে বিছানো পাথরের স্তুপ জাফলংকে করেছে আকর্ষণীয়। জাফলং, সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার অন্তর্গত, একটি পর্যটনস্থল। এটি বাংলাদেশের অন্যতম একটি পর্যটনস্থল হিসেবে পর্যটকদের কাছে পরিচিত।
সীমান্তের ওপারে ভারতীয় পাহাড় টিলা, ডাউকি পাহাড় থেকে অবিরাম ধারায় প্রবাহমান জলপ্রপাত, ঝুলন্ত ডাউকি ব্রীজ, পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ হিমেল পানি,উঁচু পাহাড়ে গহিন অরণ্য ও সুনসান নিরবতার জন্য পর্যটকদের মুগ্ধকর নয়নে দারুণ আকর্ষণ করে। প্রকৃতির এই দৃশ্য দেখতে প্রতিদিনই দেশী-বিদেশী পর্যটকরা ছুটে আসেন জাফলংয়ে।
ভ্রমন পিয়াসীদের কাছে জাফলং এর আকর্ষণই যেনো অন্যরকম। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সিলেট ভ্রমণে আসেন তাদের কাছে জাফলং না দেখলে যেনো ভ্রমণই অসম্পন্ন থেকে যায়।
৪.জাফলংয়ের বল্লাঘাট থেকে জেলা পুলিশের সহায়তায় অনলাইন প্রেসক্লাবের বনভোজন বাসটি সরাসরি পর্যটনস্পটে নিয়ে যাওয়া হয়। মনোরম এ বনভোজনে উপভোগ করতে আমরা সবাই বাস থেকে নেমে পাহাড়ী উঁচুনিচু মেঠোপথে হেঁটে যাই। যেতে যেতে চোখে পড়ে নিত্যদিনের ব্যবহারী বাহারী ধরনের জিনিস পত্র পসরা সাজিয়ে বসছে দোকানীরা। এসব দেখে চলি জিরো পয়েন্টের দিকে। শীতকালে তেমন পানি না থাকায় ছোটবড় সাদা পাথরের উপর ভর করে আমরা যে যার মত করে প্রকৃতিকে মোবাইলের ক্যামেরাতে নিজেদের বন্দি করি।
সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাবের সভাপতি কবি মুহিত চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক মকসুদ আহমদ মকসুদ, সহসভাপতি গোলজার আহমদ হেলাল এবং কার্যকরী সদস্য আশীষ দে বাহারী রং সাজানো ছোট্ট নৌকায় ওঠেন। জাফলংয়ের স্বচ্ছ জলে নৌকায় বসে কবি মুহিত চৌধুরী গেয়ে ওঠেন ‘ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে, ময়ূরপঙ্খী নায়’। শৈশব আর কৈশোরের দুরন্তপনাকে মিস করে নৌকার বৈইঠা হাতে নিয়ে সেই সময় ফিরে যান সাংবাদিক মকসুদ আহমদ মকসুদ। ভ্রমনপিয়াসী মন নিয়ে সবাই জাফলং বাংলো পাশে মরিয়ম রেস্টেুরেন্ট প্রবেশ করতেই দেখি আমাদের জন্য আগে থেকে খাবার টেবিল রেডি। বোয়াল, চিকেন, সবজি আর ডাল ভাত দিয়ে লাঞ্চ শেষ হয়।
৫ দুপুর গড়িয়ে বিকেল তারপর শুরু হয় র‌্যাফেল ড্র। বনভোজনের অন্যতম আর্কষণ র‌্যাফেল ড্র এর পুরস্কার পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হন সাংবাদিক মকসুদ আহমদ মকসুদ, আফরোজ খান, ফারহানা বেগম হেনা ও ফাইজা রাফা। এসময় সভাপতির বক্তব্যে কবি মুহিত চৌধুরী বলেন, সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব ডিজিটাল সাংবাদিকতার রোল মডেল। আমাদের ঐক্যবদ্ধ শক্তি সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাবকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে। ক্লাবের অনুপস্থিত এবং উপস্থিত সকল সদস্যদের ধন্যবাদ জানান। বিশেষ করে ধন্যবাদ জানান সিলেট জেলা পুলিশ, নিরাপদ সড়ক চাই এবং বনভোজনে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে।
সন্ধ্যাবাতি জ্বলতেই চা বিরতি পরে মুগ্ধকর বনভোজনের চমৎকার স্মৃতি নিয়ে আমাদের বাস চলছে আপননীড়ে দিকে।
সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাবের বার্ষিক বনভোজনে যারা অংশ নিয়েছিলেন- আব্দুল হাসিব, এম.এ ওয়াহিদ চৌধুরী, আলমগীর, এম.এ হান্নান, আবু জাবের, জুনায়েদুর রহমান, লোকমান হাফিজ, মাহমুদ খান, ডি.এইচ.মান্না, শাহিন আহমদ, মইনুল হাসান আবির, জসিম আহমদ ও সজিব প্রমূখ।
তাসলিমা খানম বীথি
সাংবাদিক ও লেখক।

সিলেট।