ভাষার সংগ্রামঃএকুশের চেতনা এবং প্রেরণার বিপ্লবী মাস শুরু

প্রকাশিত: ১১:৩২ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৩১, ২০২৪ | আপডেট: ১১:৩২:অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৩১, ২০২৪

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান:
বছর ঘুরে ফিরে এলো আবারও ফেব্রুয়ারী মাসের সংগ্রামী প্রথম দিন আজ বৃহস্পতিবার থেকে শুরু!
প্রতি বছর ভাষা আন্দোলনের বেদনাবিধুর স্মৃতি ও সংগ্রামী চেতনার অমিয় ধারাকে বহন করে একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের দরজায় আসে, যা এক রক্তঝরা সংগ্রামের পথ ধরে বাঙালি জাতির জীবনে এসেছিল আজ থেকে ৭০ বছর আগে। এর সঙ্গে বাঙালির গৌরব ও রক্তে রঞ্জিত বেদনার ইতিহাস জড়িয়ে আছে ওতপ্রোতভাবে। মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার এ গৌরবগাথা বাঙালির এক অনন্য অর্জন। তবে আমাদের এ অর্জন আজ আর দেশের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আমাদের নিজস্ব ভৌগোলিক সীমারেখাকে অতিক্রম করে এ বিজয় বারতা পৌঁছে গেছে পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে। আজ একুশে ফেব্রুয়ারি শুধু আমাদের নয়, সারা বিশ্বের, সমগ্র মানবমণ্ডলীর। এ অর্জন আমাদের মাথায় পরিয়েছে যেমন বিজয় মুকুট, তেমনি বাঙালির শিরকে করেছে হিমালয়সম উচ্চ ও মহিমাময়। আর বিশ্বদরবারের কাছ থেকে এ অর্জনের স্বীকৃতি আদায়ে অসীম প্রেরণা জুগিয়েছে বাঙালির সংগ্রামী চেতনাকে।
মূলত স্বাধীনতাণ্ডপরবর্তী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাঙালির যেসব অর্জন রয়েছে, তার মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ অর্জন বলে এখনো সর্বমহলে সব সময় প্রতিভাত হয়। কেননা একুশের চেতনা ধারণ করেই বাঙালি জাতি ছিনিয়ে এনেছিল স্বাধীনতার লাল সূর্যকে। অত্যাচার আর শোষণের কালো হাত গুঁড়িয়ে দেওয়ার শক্তি ও প্রেরণা এসেছে এই একুশের চেতনা থেকেই। বাঙালির প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে, এমনকি অর্থনৈতিক সংগ্রামেও এটি অনুঘটক হিসেবে আজও কাজ করে। এই চেতনা আমরা মনেপ্রাণে লালন করি বলেই বিশ্বসভায় বাংলাদেশ ও ভাষার পরিচিতি-মর্যাদা সমসাময়িককালে বহু গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশের মানুষের জাতীয় জীবনের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যের একটি বড় অধ্যায় জুড়ে রয়েছে মহান একুশে ফেব্রুয়ারি। মায়ের মুখের ভাষার সতীত্ব রক্ষায় বাংলার দুরন্ত-দুর্জয় সন্তানরা আপন বুকের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তা বিশ্বের ইতিহাসে আর দ্বিতীয়টি নেই। অমর একুশে তাই আমাদের জাতীয় জীবনে বেদনাবিধুর এক গৌরব গাথা। জাতীয় চেতনার উন্মেষ ঘটানোর ক্ষেত্রে এই দিনটির তাৎপর্য অপরিসীম। এ দিনেই বুকের তাজা রক্ত ঝরিয়ে অর্জিত হয়েছে বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতির অধিকার। যেহেতু এ দিবস আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, তাই এ দিবসে প্রত্যেক ভাষার মানুষ নিজের মাতৃভাষাকে যেমন ভালোবাসবে, তেমনি অন্য জাতির মাতৃভাষাকেও সমানভাবে মর্যাদা দেবে।
একুশে ফেব্রুয়ারি মূলত বাংলা ভাষার ন্যায্য অধিকার আদায়ের বলিষ্ঠ সংগ্রামের ইতিহাস। এরই প্রেক্ষাপটের সূত্র ধরে একুশের আন্দোলন একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলনে রূপ নিলে তার তীব্রতা ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ে তৎকালীন বাংলার রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে। এটি বাঙালির অধিকার আদায়ের প্রথম সফল সংগ্রাম। পরে প্রতিটি আন্দোলনে এটি একটি মাইলফলকের মতো কাজ করেছে। মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠা করার জন্য যে সংগ্রাম করতে হয়েছে সেই সংগ্রামের মাধ্যমেই জনসাধারণ বুঝতে শিখেছে, শোষকের বিরুদ্ধে জোরালোভাবে রুখে না দাঁড়ালে অধিকার আদায় স্বপ্নাতীতই থেকে যায়; আর এর জন্য অবলীলায় রক্ত ঝরাতে হয়। পরে একুশের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েই ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণ-আন্দোলন, ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচন এবং সর্বোপরি ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে জয়লাভ করা বাংলার জনগণের পক্ষে সম্ভব হয়েছিল। এখনো এ দেশের জনগণ সব স্বৈরাচারী অপশক্তির বিরুদ্ধে সব সময় আত্মসচেতন হয়ে নিজেদের ন্যায্য অধিকার এবং দেশের শান্তিশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সদা সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়ে থাকে। অতীতের বিভিন্ন সফল সংগ্রামই তাদের বর্তমান সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা জুগিয়ে চলেছে।
মানুষের ভাব, ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ইতিহাসের বাহন হলো তার মায়ের ভাষা। এ ভাষাতেই সব মানবসন্তান কথা বলে, স্বপ্ন দেখে, হাসে, কাঁদে, গান গায়। সুতরাং সে ভাষার গুরুত্ব প্রতিটি মানুষের জন্য, প্রতিটি জাতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা জানি, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে ভাষা হচ্ছে সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। মাতৃভাষার প্রচলন কেবল ভাষাগত বৈচিত্র্য ও বহু ভাষাভিত্তিক শিক্ষাকেই উৎসাহিত করবে না, তা ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উন্নয়ন ও অনুধাবনের ক্ষেত্রে অবদান রাখবে। পারস্পরিক বোঝাপড়া, সহনশীলতা ও সংলাপের ওপর ভিত্তি করে বিশ্ব সংহতি আরো জোরদার হবে। বিশ্বব্যাপী ভাষা দিবস পালন ও চর্চার মাধ্যমে মাতৃভাষার প্রতি মানুষের আরো বেশি মমত্ববোধ ও ভালোবাসার সৃষ্টি হবে। এর মাধ্যমে প্রত্যেক জাতির মাতৃভাষা স্বমহিমায় ভাস্বর হয়ে বিশ্ব দরবারে পরিচিতি লাভ করার সুযোগ পাবে। যার ফলে পৃথিবীর সব জাতির ভাষার প্রতি যেমন অন্যের শ্রদ্ধাবোধ বাড়বে, তেমনি প্রতিটি ক্ষুদ্র ভাষাগোষ্ঠীও তাদের ভাষার উন্নয়নে মনোযোগী হবে। যেহেতু ভাষার জন্য বাঙালিরাই প্রথম আত্মদান করেছিল, তাই বিশ্বব্যাপী এ দিবস পালনের মাধ্যমে পৃথিবী জানতে পারছে বাঙালির আত্মনিবেদনের কথা, তাদের লড়াই-সংগ্রামের কথা, তাদের অধিকারবোধ ও আত্মসচেতনতার কথা। এর মধ্য দিয়ে শহীদদের রক্তদান, জীবন বিসর্জন আরো বেশি সার্থক হয়ে উঠবে। সাম্প্রতিককালে পৃথিবীর অনেক দেশেই ভাষা শহীদদের স্মরণে ঢাকা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আদলে অনেকগুলো শহীদ মিনার নির্মিত হয়েছে, বিশ্ববাসী আগ্রহভরে জানছে বাঙালির সংগ্রামকে, তাদের আত্মত্যাগকে, যা আমাদের জাতীয় জীবনের জন্য এক বড় পাওয়া।
পরিশেষে বলতে হয়, তাবৎ পৃথিবীকে পর্যদুস্ত করা এই করোনা অতিমারির দুর্দান্ত প্রাদুর্ভাবকালে আজকে যে একুশ আমাদের দ্বারে উপনীত, সেই একুশ নতুন শপথের অঙ্গীকার নিয়ে নতুন সাজে আমাদের মাঝে এসেছে। যেমনি করে একাত্তরে দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য দল-মত, শ্রেণি-পেশা, জাত-পাত, ধর্ম-বর্ণ, উঁচু-নিচু নির্বিশেষে সব বাঙালি শপথ নিয়ে এক কাতারে শামিল হয়েছিল। আর মহান একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস তো বাঙালির জাতীয় জীবনে এক অবিস্মরণীয় ও আত্মপ্রত্যয়ের দিন। এ দিনটি বাঙালির মানবাধিকারের চিরন্তন ধারক ও বাহক। একুশ আমাদের মুক্তির চেতনা। কিন্তু এ চেতনা আজ বাংলাদেশের সর্বত্র অনুসৃত হচ্ছে না। শঠতাণ্ডবিভাজনের রাজনীতি, দুর্নীতিবাজ, সুবিধাবাদী ও দালালচক্রের সংস্কৃতিপরায়ণ মনোভাব একুশের চেতনার রংকে ক্রমেই বর্ণহীন ফিঁকে করে দিচ্ছে আর জাতির মধ্যে তৈরি করছে বিভেদের পাহাড়সম দেয়াল, যা মহান একুশ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তাই এই সোনার বাংলার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সচেতন করে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য একুশের চেতনাকে সর্বদা জাগিয়ে রাখতে হবে; কোনোভাবেই তা মানতে হতে দেওয়া যাবে না। আর সুখী-সমৃদ্ধ-উন্নত আধুনিক বাংলাদেশ গড়তে এ মুহূর্তে জাতির সব ভেদাভেদ, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, হিংসা-হানাহানি ভুলে এক অপরের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করা ছাড়া আর কোনো বিকল্পপন্থা আছে বলে আমাদের জানা নেই।
লেখকঃ গবেষক ও কলামিস্ট