সর্বশেষ

হোয়াইট হাউস থেকে বিদায়ের পর কী করবেন ট্রাম্প?

  |  ১৮:১৯, জানুয়ারি ১৯, ২০২১

বেশিরভাগ সদ্য সাবেক প্রেসিডেন্ট তাদের অবসর জীবন কাটান গলফ খেলে, ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে, মোটা অঙ্কের সম্মানিতে বক্তৃতা দিয়ে কিংবা আত্মজীবনী লিখে। তবে গলফ খেলা ব্যতীত বাকি বিষয়গুলো সম্ভবত ডনাল্ড ট্রাম্পের জন্য প্রযোজ্য নয়।

বুধবার শেষ হচ্ছে তার মেয়াদ। ১৮৬৯ সালে প্রেসিডেন্ট অ্যান্ডরু জনসনের পর এবারই প্রথম কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার উত্তরসূরির অনুষ্ঠানে থাকবেন না। ট্রাম্প এরপর কী করবেন তা নিয়ে সোজাসাপ্টা কোনো উত্তর নেই। তিনি হোয়াইট হাউস ছাড়ার পর কী করবেন, তা-ও স্পষ্ট নয়। ট্রাম্প বলছেন, তিনি তার ব্যক্তিগত ক্লাব মার-এ-লাগোতে থাকবেন। তবে ফ্লোরিডার পাম বিচে অবস্থিত ক্লাবটির প্রতিবেশী অনেকেরই আপত্তি আছে তার সেখানে থাকা নিয়ে।

৬ই জানুয়ারি এক বক্তৃতার মাধ্যমে সমর্থকদের উস্কানি দেন তিনি। তারই ফলে তার সমর্থকরা মার্কিন আইনসভা কংগ্রেস ভবন বা ক্যাপিটল হিলে আক্রমণ চালায়।

আর ওই ঘটনায় তাকে দ্বিতীয়বারের মতো অভিশংসন করেছে কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ। কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ বা সিনেট যদি এই অভিশংসন বহাল রাখে, তাহলে তিনি ভবিষ্যতে কোনো সরকারি পদে প্রার্থিতা বা নিয়োগপ্রাপ্ত হতে পারবেন না।

কর্পোরেট আমেরিকার অনেক বড় বড় কোম্পানি ট্রাম্পকে এড়িয়ে চলছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে তাকে অপসারণ করা হচ্ছে। দেশের কোটি কোটি মানুষ তাকে ঘৃণা করে।

আবার দেশের কোটি কোটি মানুষের কাছে তিনি প্রিয়পাত্র। ফলে ট্রাম্প আবারো প্রেসিডেন্ট পদে দাঁড়ান আর না দাঁড়ান, তার রাজনৈতিক পুঁজি থাকছেই। তবে টুইটার প্রোফাইল না থাকায় নতুন অনুসারী খুঁজতে তার কষ্টই হবে। এছাড়া মূলধারার গণমাধ্যমেও হয়তো তাকে অতটা জায়গা দেয়া হবে না। তাই গুঞ্জন উঠছে, রক্ষণশীলদের প্রিয় চ্যানেল ফক্স নিউজকে টেক্কা দিতে তিনি নিজেই খুলতে পারেন একটি টিভি চ্যানেল। আবার টুইটারকে টেক্কা দিতে নতুন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও খুলতে পারেন তিনি। তবে অবসরকালীন সময়ে মামলার পর মামলায় জর্জরিত থাকবেন তিনি। ক্যাপিটল হিল হামলার আগ থেকেই তার বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলা চলমান ছিল। ছিল ফৌজদারি তদন্তও। ফলে এমনটাও সম্ভব ট্রাম্প জেলেও যেতে পারেন!

কিন্তু ট্রাম্পকে হিসাবের বাইরে রাখা উচিত হবে না। নব্বইয়ের দশকে আটলান্টিক সিটি ক্যাসিনো দেওলিয়া হওয়ার পর তাকে হিসাবের খাতায় রাখেনি কেউ। কিন্তু এক দশক পর ‘দ্য অ্যাপ্রেন্টিস’ শোর উপস্থাপক হিসেবে ফের তিনি আলোচনায় ফিরেন। আবার তার টেলিভিশন রেটিং যখন পড়তির দিকে ছিল, তখন তিনি প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার জন্মস্থান নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেন। ‘বার্থার’ ষড়যন্ত্র প্রচারের মাধ্যমে তিনি নতুন একটি ডানপন্থি অনুসারীগোষ্ঠী তৈরি করেন, যারা তাকে শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্টও বানায়। সর্বশেষ নির্বাচনে তিনি জো বাইডেনের কাছে হারলেও তার ভোটের ব্যবধান প্রত্যাশার চেয়েও কম ছিল।

রাজনীতি
ক্যাপিটল হিল দাঙ্গার আগ পর্যন্ত সবাই ধরে নিয়েছিলেন যে ট্রাম্পই হবেন রিপাবলিকান পার্টির ধারকবাহক। ২০২৪ সালে হয়তো ফের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়বেন। কিংবা পার্টিতে কিংমেকার হবেন। এছাড়াও যেসব রিপাবলিকান তার বিরুদ্ধে গেছেন, যেমন, জর্জিয়ার গভর্নর ব্রায়ান কেম্প, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধও নিতে পারেন।
কিন্তু সব দৃশ্যপট পালটে যায় ৬ই জানুয়ারির পর। জানুয়ারির ১৫ তারিখে পিউ রিসার্চের একটি জরিপে দেখা যায়, মাত্র ২৯ শতাংশ জনগণ মনে করেন ট্রাম্প তার কাজে সফল। ৬৮ শতাংশ মানুষ বলেছেন, তারা চান না ট্রাম্প মার্কিন রাজনীতিতে বড় খেলোয়াড় হয়ে থাকুক।

এই দাঙ্গায় কনজারভেটিভ পার্টিতেও বিভেদ সৃষ্টি হয়েছে। রিপাবলিকান পার্টির তৃতীয় সর্বোচ্চ নেতা লিজ চেনি সহ ১০ জন কংগ্রেস সদস্য ডেমোক্রেটদের পক্ষ নিয়ে ট্রাম্পের অভিশংসনে সহায়তা দিয়েছেন।

সিনেটে পার্টির নেতা মিচ ম্যাককনেলসহ বেশ কয়েকজন রিপাবলিকান সিনেটর ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ট্রাম্পকে অপসারণে তারা সমর্থন দিতে পারেন। ক্ষমতা থেকে বিদায়ের পরও সিনেটে বিচার চলবে। আর তা হলে, তিনি ভবিষ্যতে আর কোনো সরকারি পদে দাঁড়াতে পারবেন না।

রিপাবলিকানদের সমর্থক বলে পরিচিত একাধিক কর্পোরেশন বা ব্যবসায়ি গোষ্ঠী বলেছে, গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে ট্রাম্প যে প্রশ্ন তুলেছেন, আর তাতে যেসব রিপাবলিকান প্রার্থী সমর্থন দিয়েছে, তাদেরকে তারা অর্থ দেবেন না।

কিন্তু তারপরও রিপাবলিকান পার্টির পপুলিস্ট উইং-এর সমর্থন ট্রাম্প পাবেন। ৮ই জানুয়ারি রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটির চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান হয়েছেন ট্রাম্পের মিত্র রোনা রমনি ও টমি হিকস। কংগ্রেসের নিম্নকক্ষে ১০ জন রিপাবলিকান সদস্য অভিশংসনের পক্ষে থাকলেও, বেশিরভাগই বিরুদ্ধে ছিলেন। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যই নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। বেশিরভাগ রিপাবলিকান ভোটার এখনও তাকে সমর্থন করেন। তারা তাকে দাঙ্গার জন্য দায়ীও করেন না।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম
ক্যাপিটল হিল দাঙ্গার পর টুইটার ট্রাম্পের ৮ কোটি ৮০ লাখ অনুসারী সমেত প্রোফাইলটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয়। এরপর ফেসবুক থেকেও তিনি নিষিদ্ধ হন। সেখানে রয়েছে ৩ কোটি অনুসারী। তবে ট্রাম্পের নিজস্ব মোবাইল অ্যাপ গত বছর ২৬ লাখবার ডাউনলোড হয়েছে। সেখানে ব্যবহারকারীদের ফোন নাম্বার রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, টুইটার ও ফেসবুক থেকে নিষিদ্ধ হলেও রিপাবলিকানদের মধ্যে ট্রাম্পের অনলাইন উপস্থিতি এখনো বেশ জোরালো। সমর্থকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ক্ষেত্রে তার সমস্যা হবে না। কিন্তু এদের বাইরে নিজেকে নিয়ে যেতে সমস্যায় পড়বেন তিনি। এছাড়া পেপাল সহ অনেক অনলাইন পেমেন্ট কোম্পানি থেকে নিষিদ্ধ হওয়ায় অর্থ ও অনুদান সংগ্রহেও বিপদে পড়বেন তিনি।

দ্য ট্রাম্প প্রতিষ্ঠানসমূহ
ট্রাম্প ব্যবসায়ী হিসেবে মূলত রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার। তার রয়েছে ট্রাম্প টাওয়ার ব্রান্ড। এছাড়াও নিউ জার্সির বেডমিনস্টারে রয়েছে তার গলফ সেন্টার। কিন্তু ট্রাম্পের রাজনীতির কারণে তার রিয়েল এস্টেট, হোটেল ও গলফ কোর্স ব্যবসায় নেতিবাচকতা দেখা দিয়েছে। কেননা, এগুলোর বেশিরভাগই নিউ ইয়র্ক বা অন্যান্য ডেমোক্রেটঘেঁষা রাজ্যে।

ট্রাম্পের বেডমিনস্টার গলফ ক্লাবকে ২০২২ সালের পিজিএ গলফ চ্যাম্পিয়নশিপ থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এর আগে চার্লোটসভাইলে শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদীদের সমর্থনে ট্রাম্পের দেওয়া বক্তব্যের জের ধরে অনেকেই তার মার এ লাগো হোটেল গণহারে পরিত্যাগ করেছে। এছাড়া করোনাভাইরাসের কারণে তার রিয়েল এস্টেট ব্যবসা মার খাচ্ছে।
ট্রাম্পের বিভিন্ন কোম্পানির প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ঋণ রয়েছে। এগুলোর বেশিরভাগের জিম্মা তার। বড় ব্যাংকগুলোর মধ্যে ডয়েচে ব্যাংক তার প্রতিষ্ঠানের সাথে ব্যবসা করেছে বেশি। ঋনও দিয়েছে বেশি। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি বলছে, তারা আর ট্রাম্পকে ঋণ দেবে না। সিগনেচার ব্যাংকের মতো আকারে ছোটো কিছু ব্যাংকও সামিল হয়েছে এই ঘোষণায়। মধ্যস্বত্বভোগী প্রতিষ্ঠান কাশম্যান ওয়েকফিল্ড ও জেএলএলও তাকে পরিত্যাগের ঘোষণা দিয়েছে, ফলে সম্পদ বিক্রি করে অর্থ জোগাড় করাও কঠিন হবে। তবে ট্রাম্প হয়তো আমেরিকার বাইরে, যেমন ব্রাজিল, তুরস্ক, ফিলিপাইন ও ভারতে ব্যবসা করতে পারবেন। সেখানে তার যথেষ্ট জনপ্রিয়তা রয়েছে। তার প্রশাসন সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করেছে। এসব দেশে আগে থেকেই তার ব্যবসা ছিল। ফলে এসব দেশেও ব্যবসায়িক সম্ভাবনা আছে ট্রাম্পের।

মিডিয়া
লাইমলাইট সব সময়ই প্রিয় ট্রাম্পের। ফলে অনেকে ধরেই নিয়েছেন মিডিয়ায় সুযোগ খুঁজবেন তিনি। হয়তো বই লেখার চুক্তি। বা কোনো নিউজ চ্যানেলে মন্তব্যকারী হিসেবে। কিংবা নিজেরই কোনো মিডিয়া ভেঞ্চার চালু করার মাধ্যমে।

সম্প্রতি এমন গুঞ্জনও ছড়িয়েছে যে ট্রাম্প তার ‘অ্যাপ্রেন্টিস’ শো ফের চালু করতে চান। এই শো থেকে ট্রাম্প প্রায় ৪২৭ মিলিয়ন ডলার কামিয়েছেন। আর তা থেকেই নিজের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য ফের লাইনে আনতে পেরেছিলেন।
নভেম্বরে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, হিকস ইকুইটি পার্টনার্স নামে ট্রাম্পের মিত্র ও আরএনসির ভাইস চেয়ার টমি হিকসের একটি প্রতিষ্ঠান নতুন টিভি চ্যানেল দাঁড় করাত অর্থ সংগ্রহ করছিল। তবে ফক্সের বিকল্প দাঁড় করাতে পারবেন কিনা ট্রাম্প তা নিয়ে সন্দেহ আছে।

প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও তার স্ত্রী নিজেদের আত্মজীবনী লেখার জন্য অগ্রিম নিয়েছিলেন ৬৫ মিলিয়ন ডলার। ট্রাম্প এর চেয়েও বেশি অর্থ কামাতে চাইবেন। মূলধারার প্রকাশনা সংস্থাগুলো ট্রাম্পের বই ছাপাতে মোটেই দ্বিধা করবে না।

রিটেইল বাণিজ্য
ট্রাম্প নিজের নামে ব্রান্ডি করতে পছন্দ করেন। তার নামে বিভিন্ন ভবন আছে, তেমনি প্রাপ্তবয়স্কদের শিক্ষা, ভদকা, মেইল-অর্ডার স্ট্রিকসও আছে। তার মেয়ে ইভাঙ্কা ট্রাম্পও নিজের নামে ফ্যাশন ব্রান্ড খুলেছিলেন। কিন্তু ব্রান্ড হিসেবে ‘ট্রাম্প’ নাম এখন বেশ বিষাক্ত। বিভিন্ন রিটেল প্রতিষ্ঠান ট্রাম্প-ব্র্যান্ডের পণ্য সরিয়ে ফেলেছে। ২০১৭ সালে পিতার উপদেষ্টা হিসেবে ইভাঙ্কা ট্রাম্প দায়িত্ব গ্রহণের পর ‘ইভাঙ্কা’ ব্রান্ডের পণ্যও নামিয়ে ফেলা হয়। নর্ডস্ট্রম, নিম্যান মার্কাস বা হাডসন বে- সবাই সরিয়েছে। এখন ইবে বা থ্রেইউপি নামে সেকেন্ড হ্যান্ড পণ্যের রিটেলারদের কাছেই সেসব পণ্য পাওয়া যায়। ই-কমার্স প্ল্যাটফরম শপিফাই সম্প্রতি ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে।
গ্রাহক নির্ভর খুচরা বাজার ধরার কোনো ইচ্ছার কথা ট্রাম্প পরিবার এখনো জানায়নি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ