সিলেট জেলার ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার কটালপুর গ্রামে আওয়ামীলীগ নেতা ভূমিদস্যু রফিক উল্লাহ ও মুজিব বাহিনীর সন্ত্রাসী হামলা, জমি দখল, মিথ্যা মামলা এবং প্রবাসীর পরিবারের নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করেছেন ভুক্তভোগী প্রবাসী পরিবার।
মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারী) দুপুরে সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাবের ড.রাগীব আলী মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী প্রবাসী পরিবার এই অভিযোগ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন আনা মিয়া। তিনি জানান, তিনি একজন প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধা। দীর্ঘ ৩৩ বছর প্রবাসে হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর ২০২৫ সালে নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে তিনি দেখতে পান, প্রবাসে থাকার সুযোগে তার বৈধ মালিকানাধীন জমি ভূমিখেকোদের দখলে চলে গেছে।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, আনা মিয়ার বাড়ি সিলেট জেলার ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার কটালপুর গ্রামে। তার মালিকানাধীন ফেঞ্চুগঞ্জ মৌজার জেএল নং–১, খতিয়ান নং–১৮০৭, দাগ নং–১৫৪৭১-এর অন্তর্ভুক্ত ৩১ শতক জমির সকল বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের শেল্টারে স্বৈরাচার আওয়ামী সরকারের আমলে স্থানীয় রফিক উল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে জমিটি অবৈধভাবে দখল করে রেখেছেন। একইভাবে সালেহ আহমদ ও ইলন আহমদের জমিও তিনি জোরপূর্বক দখল করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়। এছাড়া আরও বহু মানুষের জমি তার দখলে রয়েছে এবং এ নিয়ে একাধিক মামলা চলমান রয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
ভুক্তভোগীরা জানান, তারা শান্তিপ্রিয় মানুষ এবং কখনো ঝগড়া বা শক্তি প্রদর্শন চাননি। বিষয়টি তারা পাড়া-মহল্লার মুরব্বিদের মাধ্যমে বিষয়টি সালিসের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে আমরা ফেঞ্চুগঞ্জ উত্তর কুশিয়ারা ৪নং ইউনিয়ন পরিষদের দারস্থ হোন। এবং ইউনিয়ন পরিষদের সম্মানিত চেয়ারম্যান আহমদ জিলু সাহেবের কাছে বিষয়টি তুলে ধরেন। চেয়ারম্যান সকল কাগজপত্র যাচাই করে তাদের দাবি সঠিক বলে স্বীকৃতি দেন। সালিশের জন্য উভয় পক্ষকে ৫০ হাজার টাকা আনামত হিসেবে দিতে বলা হয়, যা তারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে প্রদান করেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন ৫নং ওয়ার্ডের আওলাদ মেম্বার, ৭নং ওয়ার্ডের বদরুল মেম্বার, ৬নং ওয়ার্ডে সাজ্জাদ মেম্বার, অত্র এলাকার বিশিষ্ট সালিশ ব্যক্তিত্ব কুতুব আলী এবং অত্র এলাকার সকল গণ্যমান্য ব্যাক্তিবর্গ।
কিন্তু রফিক উল্লাহ সালিসে উপস্থিত হননি এবং আনামতের টাকা প্রদান করেননি। চার দিন অপেক্ষার পর চেয়ারম্যান আনামতের টাকা ফেরত দেন এবং জমি পরিমাপের জন্য একটি প্রতিনিধি দল গঠন করেন।
চেয়ারম্যানের নির্দেশ অনুযায়ী ২১ জানুয়ারি জমি পরিমাপের দিন নির্ধারিত হয়। এর আগে ২০ জানুয়ারি বিষয়টি চেয়ারম্যানকে অবহিত করা হয়। ২১ জানুয়ারি ইউনিয়ন পরিষদের ৬নং ওয়ার্ডের সাজ্জাদ মেম্বার ও ৮নং ওয়ার্ডের ছমির মেম্বার প্রতিনিধি হিসেবে সরেজমিন উপস্থিত হন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন লেগুনা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুস সালাম, ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ডাক্তার আজাদসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
এ সময় রফিক উল্লাহ উপস্থিত হয়ে জমি পরিমাপ বন্ধ করতে বলেন এবং জমিটি তার বলে দাবি করেন। উপস্থিত মুরব্বিরা তাকে শান্ত থাকার অনুরোধ জানালে তিনি উত্তেজিত হয়ে দেশীয় লাঠিসোটা নিয়ে তার দলবলসহ উপস্থিত মুরব্বিদের ওপর হামলার চেষ্টা চালান।
উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে পুনরায় সালিসের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মুরব্বিরা উভয় পক্ষের জন্য এক লাখ টাকা করে আনামত ধার্য করেন। আনা মিয়া একই দিন সন্ধ্যায় ছমির মেম্বারের কাছে এক লাখ টাকা প্রদান করেন। তবে রাত ১০টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও রফিক উল্লাহর পক্ষ থেকে আনামতের টাকা আদায় করা সম্ভব হয়নি। পরে মুরব্বিরা আইনের আশ্রয় নেওয়ার পরামর্শ দেন।
এরপর আনা মিয়া ফেঞ্চুগঞ্জ থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। এসআই শরিফুল ইসলাম ২৪ অথবা ২৫ জানুয়ারি সরেজমিনে পরিদর্শনের কথা বললেও এখন পর্যন্ত তিনি ঘটনাস্থলে যাননি। থানায় অভিযোগ দায়েরের পর থেকেই রফিক উল্লাহ বিভিন্নভাবে হুমকি দিতে থাকেন বলে অভিযোগ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ২৫ জানুয়ারি ৬নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য সাজ্জাদ আলীর জমিতে কাজ করার সময় সালেহ আহমদকে একা পেয়ে রফিক উল্লাহ, তার ছেলে জাকির, তার ভাতিজা মুজিব মিয়াসহ ৫/৬ জন সশস্ত্র হামলা চালায়। ঘটনাটি ঘটে লুলু মিয়ার বাড়ির সামনে। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে যায়।
পরবর্তীতে চিকিৎসার জন্য যাওয়ার পথে আবারও হামলা চালানো হয়। এ সময় তারা কুতুব আলীর বাড়িতে আশ্রয় নিলে কুতুব আলীর বাড়িতে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় আহতদের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসক গুরুতর আহত ইলন মিয়া ও ইব্রাহিম আলীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করেন।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভুক্তভোগীরা জানতে পারেন, রফিক উল্লাহ ও মুজিব মিয়া গং তাদের ওপর হামলার অভিযোগ এনে গ্রামের বিশিষ্ট মুরব্বি, আত্মীয়স্বজনসহ ৩১ জনের নামে মামলা দায়ের করেছে। এছাড়া কুতুব আলীর পরিবারের সাত সদস্য, লুলু মিয়া ও তার পরিবারের পুরুষ সদস্যদের এবং সালেহ আহমদের মামা গেদা মিয়ার পরিবারের সদস্যদেরও মামলায় আসামি করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, রফিক উল্লাহ ও মুজিব মিয়ার গং দীর্ঘদিন ধরে সরকারি খাস জমি, রেল ও হাওরের জমি দখল করে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে আসছে। তাদের নির্যাতনে পুরো এলাকার মানুষ অতিষ্ঠ।
সংবাদ সম্মেলন থেকে ভুক্তভোগীরা রাষ্ট্রের কাছে দাবি জানান- তাদের ওপর সংঘটিত হামলার নিরপেক্ষ তদন্ত চান, হামলাকারীদের যেনো দ্রুত গ্রেপ্তার করা হয়, তাদের নামে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার চান, বৈধ জমি ফেরত চান ও প্রবাসী পরিবারের জানমালের নিরাপত্তা যেনো নিশ্চিত করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আনা মিয়ার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সালেহ আহমদ, ইলন মিয়া ও বিশিষ্ট মুরব্বি কুতুব উদ্দিন।