মোহাম্মদ গোলজার আহমদ হেলাল : দীর্ঘ ১৭ বছর পেরিয়ে দৈনিক আলোকিত সিলেট দেড় যুগে পদার্পণ করেছে।আজ ২৭ আগস্ট দৈনিকটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে দৈনিকটি তার যাত্রা পথ মাড়িয়ে যাচ্ছে।তৃণমুল জনগণের আনন্দ- বেদনা,সুখ -দু:খ,হাসি-কান্না,সমস্যা-সম্ভাবনার কথা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে সবসময়।চব্বিশের ছাত্র গণ অভুথানে আগস্ট মাসের ৩ তারিখ দৈনিকটির লীড নিউজ ছিল,”ছাত্র নাগরিক অভুথানের পথে দেশ”।সম্প্রতি সিলেটের সাদাপাথর হরিলুট কান্ড টক অব দ্যা কান্ট্রি।বিগত এক বছরে পাথরলুটের কাহিনি নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন(Story) প্রকাশ করে আলোকিত সিলেট।কেম্পানীগঞ্জ,জাফলং সহ বিভিন্ন স্থানে পাথর বালু হরিলুটের কাহিনী,চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ে বছরজুড়ে দৈনিক আলোকিত সিলেটের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের ফলে প্রতিবেদকের উপর ফ্যাসিস্ট সন্ত্রাসী,লুটপাটকারী ও চাঁদাবাজদের হুমকি ধামকি ছিল অব্যাহত।অকথ্য ও অশ্লীল ভাষায় বিষোদগার করেছিল লুটেরা দুর্নীতিবাজ চোরেরা।থেমে থাকেনি আমাদের দুর্গম পথচলা।
অনেক পথ পেরিয়েছে আমাদের সাংবাদিকতা। তবুও গণমাধ্যমগুলো বিশেষ করে সংবাদপত্রসমুহ সাধারন পাঠকের প্রত্যশা আজো পূরন করতে পারেনি । তত্ত্ব ও তথ্যের অভাব , আড়ষ্ট সংবাদ পরিবেশনা , সৃজনশীলতার অভাব এবং দলীয় ও ব্যবসায়ীক দৃষ্টিভঙ্গী ও কিছু সংখ্যক পাঠকের পছন্দ- অপছন্দের উপর নির্ভরশীলতাই আমাদের সাংবাদিকতার গতিশীলতাকে ব্যাহত করছে প্রতিনিয়ত।
গণমাধ্যম ও উন্নয়ন একে অপরের পরিপুরক । বিষয়টি বর্তমান বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ন ইস্যু। গণতন্ত্রের উন্নয়নে যেমন দরকার শক্তিশালী মিডিয়া , উন্নয়নের অন্যান্যক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভুমিকা কোনো অংশে কম নয়। শক্তিশালী বার ( আইনজীবী সম্প্রদায়) যেমন শক্তিশালী বেঞ্চ ( বিচারক সম্প্রদায় ) উৎপন্ন করে , ঠিক তেমনি যেখানে শক্তিশালী গণমাধ্যমের অভাব সেখানে গনতন্ত্র ও উন্নয়ন নেই বললেই চলে।
বর্তমানে তৃণমুল ও উন্নয়ন সাংবাদিকতা বেশ জনপ্রিয় এবং এটি দ্রুত বিস্তার লাভ করছে । বাংলাদেশের একেবারের প্রথম সারির কয়েকটি গণমাধ্যমের জনপ্রিয়তার পিছনে মফস্বল ও উন্নয়ন সাংবাদিকতার অবদান সবচেয়ে বেশী । আমাদের দেশে ঢাকা থেকে প্রকাশিত জাতীয় পর্যায়ের গণমাধ্যগুলোতে এই ধারার সাংবাদিকতার বিস্তার ঘটলেও আঞ্চলিক বা স্থানীয় সাংবাদপত্র গুলোতে ( মফস্বল থেকে প্রকাশিত) এর ছোঁয়া তেমন একটা লাগেনি।সাধারন পাঠকরা সংবাদ বলতে রাজনীতি , অপরাধ আর ঘটনাকেই বুঝে থাকেন। এজন্য বাংলাদেশের কিছু জাতীয় পত্রিকা রয়েছে যেগুলো শুধুমাত্র এ তিনটি বিষয়ের সংবাদের সমাহার । মাঝে মাঝে কিছু গুজব ও থাকে । অনুসন্ধ্যানী প্রতিবেদন , মন্তব্য কলাম ইত্যাদি থাকে না । এই পত্রিকাগুলো একধরনের পাঠকের চাহিদা মেটালেও জাতীয় উন্নয়নে এদের কোন ও ভুমকিা নেই ।
“ উন্নয়ন সাংবাদিকতার মুলকথা হলো ” দৈনন্দিন সংবাদের বাইরে সমাজের বিভিন্ন সমস্যার অন্তর্নিহিত কারন খুজেঁ বের করে তা প্রকাশ এবং একই সাথে তার সমাধানের উপায় বাতলে দেয়া। উন্নয়ন সাংবাদিকতা অবকাঠামোগত ও মানবিক দুই ধরনেরই উন্নয়ন নিয়ে ব্যাপিত। অনুসন্ধ্যানী প্রতিবেদন এর প্রাণ । ভাল অনুসন্ধ্যান ছাড়া সমস্যার সঠিক রুপ ফুটেঁ উঠবে না । আর সমস্যা সঠিকভাবে চিহ্নিত না হলে সমাধান ও সম্ভব নয়।
অপরদিকে খুন, ধর্ষন , দুর্ঘটনা , দৈব দুবির্পাক এবং জাতীয় নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে জনসভা ছাড়া সাধারন অর্থে মফস্বলের ঘটনা পত্রিকার পাতায় স্থান পায়না । জাতীয় পত্রিকায় এসব ঘটনা দিয়েই সাজানো থাকে পত্রিকায় নির্ধারিত মফস্বল পৃষ্টা । মফস্বল সংবাদ , গ্রাম -বাংলা , দেশ , জেলা সংবাদ, বিশাল বাংলা প্রভৃতি নামে এই পৃষ্ঠাকে চিহিৃত করা হয় । কোনো কোনো পত্রিকা এই পৃষ্টাকে জাতীয় সংবাদ নামকরন করে থাকে । কারন তৃণমুল সংবাদও জাতীয় সংবাদ হিসাবে গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য বলে অনেকের অভিমত।
দেশের সংখ্যাগরিষ্ট দরিদ্র মানুষের দৈনন্দিন জীবন যাত্রার সঙ্গে সাংবাদিকদের সরাসরি যোগাযোগ প্রতিষ্টা করা কঠিন কাজ। এক্ষেত্রে অবাধ সুযোগও খুব একটা নেই । তৃণমুল স্তরের মানুষগুলোর সমস্যা -সমাধান সম্পর্কে পর্যাপ্ত পরিমান রিপোর্ট সাংবাদিকরা করতে পারছেন না । অথচ তৃণমুল স্তরের অধিকার বঞ্চিত মানুষগুলোর ভাগ্যের উন্নয়ন করা খুবই জরুরী । একাজটি করতে না পারলে দেশের অর্থনীতির চাকা পরিবর্তনের চিন্তাই করা দুষ্কর। মানবাধিকার, বিকল্প ধারার উন্নয়ন প্রচেষ্টা, নারী- পুরুষ বৈষম্য কমিয়ে আনা , পরিবেশের উন্নয়ন, ক্ষুদ্র ঋণদান, গণশিক্ষা ও জনস্বাস্থ্যের বিকাশ বিস্তারই এ কাজের অগ্রজ ভুমিকা রাখবে। তদুপরি আমাদের চিরচেনা আবহমান বাংলার দু:খ- পাওয়া হতভাগ্য নারী- পুরুষের অন্ধকার জীবনের কাহিনী চিত্রায়ন ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠির কাহিনী বর্ণনা এসবের মাধ্যমেই তৃণমুল স্তরের মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব।ভালো- মন্দ মূল্যায়নের মাপকাঠিতে ফেলে আমাদের সংবাদপত্র গুলোকে বিচার করলে যা বেরিয়ে আসবে তা কোনোভাবেই আশাব্যাঞ্জক নয়। প্রতিদিন প্রকাশিত হচ্ছে প্রচুর সংবাদপত্র। উপ- সম্পাদকীয় নামে ভাড়াটে বুদ্ধিজীবির একপেশেঁ নিবন্ধ ও শহুরে সমস্যা নির্ভর অধিকাংশই ফিচার। ভেতরের পাতায় আছে তৃণমুল সংবাদের উপেক্ষিত পরিবেশনা । আর থাকছে বিনোদনের নানা খবর । এই হচ্ছে আমাদের সংবাদপত্রের চেহারা।বলাবাহুল্য – এ সকল তথ্যের সবটাই কেন্দ্রাভিমুখী তথ্য প্রবাহের প্রবনতায় আক্রান্ত।
সংবাদপত্রের ইতিহাস থেকে জানা যায় – একসময় পত্রিকা প্রকাশ করত রাজনৈতিক দলগুলো তাদের মুখপত্র হিসাবে আদর্শ প্রচারের জন্য । এর পরে চলে আসে বুরোক্রেটদের হাতে। আমলাতন্ত্রের যাতাঁকলে নিষ্পেষিত হলো সংবাদপত্র। কতিপয় সমাজহিতৈষী সমাজ উন্নয়নে পত্রিকা প্রকাশ করলেও এখন বলা যায় পত্রিকার মালিকানা সিংহভাগ কর্পোরেট ব্যবসায়ীদের হাতে । ফলে সাংবাদিকতার ব্যাকরণ কিছুটা ভেঙ্গে সম্পাদকীয় নীতিতে আঘাত হানছে বলে মনে করছেন অভিজ্ঞ মহল।তাই প্রভাবশালী মহলের গন্ডি অতিক্রম করে সংবাদপত্রকে মুক্তির জন্য খুজেঁ বের করতে হবে বিকল্প সম্ভাবনার নয়া পথ।আর সাথে রাখতে হবে সাধারন মানুষের প্রত্যাশাকে।উচ্চবিত্ত সমাজের বাইরে গিয়ে নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সমুন্নত রাখতে হবে, নিচুতলার সমাজে গিয়ে নতুন আশ্রয়স্থল খুজঁতে হবে, তৈরী করতে হবে সাধরন পাঠক সমাজ।
সিলেটে রয়েছে নানা সমস্যা।অনুসন্ধান করে রিপোর্ট করার মতো অনেক ইস্যু আছে।শিক্ষারসমস্যা ,অর্থনৈতিক সমস্যা , পর্যটন খাতের সমস্যা , ধনী – গরীবের বৈষম্য, অলস টাকা , বেকার সমস্যা, সীমান্ত সমস্যা , হাওড় সমস্যা, যৌতুকের অভিশাপ, পরিবেশগত হুমকী, অপরিকল্পিত নগরায়ন, পাহাড় কাটা, ক্রাসিং ষ্টোনের নেতিবাচক প্রভাব, সরকারী পানি সরবরাহে দুর্বলতা , ভূগর্ভস্থ- পানির স্থর নিচে নেমে যাওয়া, সুরমা নদীর নাব্যতা হ্রাস ও পানি দুষন, পানির প্রবাহ নষ্ট, ময়লা- আবর্জনা সঠিক স্থানে না ফেলা , বন ধ্বংস,জলাবদ্ধতা,শব্দ দূষণ, ট্রাফিক সমস্য ছাড়া ও দৈনন্দিন কত ঘটনার আড়ালের কাহিনী । এগুলো স্থানীয় সংবাদপত্রের পাতায় নিয়মিত প্রতিবেদন হিসাবে আসলে সমাজের অনেক উন্নয়ন ঘটত।
সঙ্গত কারনে সকল খবরের স্থান পত্রিকায় সংকুলান সম্ভব নয় ।এক্ষেত্রে স্থানীয় সংবাদপত্রের পরিধি কম, ব্যপ্তি কিন্তু অনেক বেশী । সুতরাং স্থানীয় পত্রিকায় যদি ঐসব ইস্যু সম্পর্কিত রিপোর্ট যথাযথভাবে করা হয় তাহলে গণসচেতনা সৃষ্টি হবে এবং দেশের ও মানুষের উন্নয়ন ঘটবে । তাই প্রতিটি গণমাধ্যমে এমন সংবাদকর্মীর প্রয়োজন যারা পৌরোহিত্য প্রবণ সাংবাদিকতার অবসান ঘটিয়ে মানুষের জীবন ও সংস্কৃতির তথ্য সরবরাহ করবে। তারা চাইবে সুবিধাভোগির স্বার্থে লালিত পত্র -পত্রিকার অবসান। উচ্চবিত্তের রাজনীতি , ব্যবসা -বাণিজ্য , ভোগ- বিলাস , পছন্দ- অপছন্দের যে সাংবাদিকতা বৃত্তবন্দী তার পরিবর্তন ঘটানোর লক্ষ্যে নতুন ধারার , নতুন চেতনায় সমৃদ্ধ সংবাদকর্মীর প্রয়োজন সবচেয় বেশী । তারা তৃণমুল ও উন্নয়ন সাংবাদিকতার বিকাশ ঘটিয়ে সমাজ উন্নয়নে হবে প্রতিশ্রুতিশীল।
বর্তমান যুগ চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও ডিজিটালাইজেশনের যুগ।অনলাইন গণমাধ্যম একটি শক্তিশালী ,প্রভাবশালী ও ক্ষমতাবান গণমাধ্যম।আমাদের দেশের সাংবাদিকতায় অনলাইন সাংবাদিকতা একটি বিকাশমান ধারা হলেও সারা দুনিয়ায় এটি এখন বেশ জনপ্রিয়।সিটিজেন জার্নালিজমের এ সময়ে সংবাদ এখন হাতের মুঠোয়।তাই সংবাদ কর্মীদের যথেষ্ঠ দায়িত্বশীল হতে হবে।অনলাইন মিডিয়া এখন আর ফেলনা নয়।আগামী দিনে এ দেশেও ‘অনলাইন উইল বি কিং।’এটি চরম বাস্তবতা।ইহা বিজ্ঞান এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতি,বিজ্ঞানের অব্যাহত জয়যাত্রার ফল।
সাংবাদিকতা সমাজসেবার প্রধান একটি আধুনিক রুপ।চলমান জীবনের শব্দময় প্রতিচ্ছবি ,যা কখনো মন্ময়,কখনো বস্তুনিষ্ঠ।জীবন,সমাজ ও রাষ্ট্রের গতিপ্রকৃতি বর্ণণার এক প্রকৌশল।গণমাধ্যমে সংবাদ ও মন্তব্য প্রচার ও প্রকাশ করে জনসাধারণের সেবাই এর প্রধান লক্ষ্য।সংবাদ হল সামাজিক বাস্তবতা সম্পর্কিত ঘটনা যা প্রতিনিয়ত ঘটে।সমাজে সংঘাত আছে,দ্বন্ধ আছে,দুঃখ,কষ্ঠ,ভালবাসা,শ্রদ্ধা,বিভীষিকা,আবেগ,কৌতুক,রসবোধ,রহস্য,উত্তেজনা,ক্রোধ,সুবিচার,অবিচার,ন্যায়-অন্যায়,সঙ্গতি-অসঙ্গতি সবই আছে।সংবাদ কারবারীদের নির্মোহভাবে বস্তুনিষ্ঠ ও পক্ষপাতহীন এবং সত্য ও বিশ্বাসযোগ্য সংবাদ পরিবেশন করতে হবে।এটাই মুল কথা।
মনে রাখতে হবে সত্যতা হচ্ছে সাংবাদিকতার চুড়ান্ত লক্ষ্য।বস্তুনিষ্ঠতা প্রতিবেদনের প্রাণ।আমাদের সংবাদ কর্মীদের এও মনে রাখা প্রয়োজন সময় সংবাদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান।কিন্তু সত্যতা তার চেয়েও দামী।সত্যতা অত্যন্ত বলিষ্ঠ এবং সত্যতাই পরিণামে জয়ী হবে।চব্বিশের ছাত্র গণ অভুথান পরবর্তী বাংলাদেশে গণমাধ্যম এবং এর কর্মীদের নিতান্তই দায়ভার অনেক বেশী।নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের পাদপীঠে দাঁড়িয়ে সঠিক তথ্য সরবরাহ,শিক্ষাবিস্তার,প্রভাব বিস্তার ও বিনোদনের মাধ্যমে জনগণকে উদ্দীপ্ত করে সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হোক গণমাধ্যম।সাংবাদিকতা হোক গণমানুষের।।
লেখকঃ সভাপতি সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক দৈনিক আলোকিত সিলেট।