বাংলাভাষা আন্দোলন : শ্রমজীবী ও মেহনতি মানুষ – মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান

প্রকাশিত: ১১:২৪ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২৪ | আপডেট: ১১:২৪:অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২৪

ভাষা আন্দোলন একটি বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রাম। বুদ্ধিজীবীদের পরিকল্পিত এ কর্মপ্রয়াসে শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের অংশগ্রহণ ছিলো চোখে পড়ার মতো। এমনকি ভাষার জন্য রক্ত দেওয়ার ইতিহাসেও তাদের অবদানকে অস্বীকার করার উপায় নেই। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কয়েক মাসের মধ্যেই বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে ১৯৪৮ সালের প্রথমদিকে ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। বুদ্ধিবৃত্তিক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মাধ্যমে এর সূচনা হলেও ক্রমশ এটি একটি রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়। ১৯৪৮ সাল থেকে অনেকটা শিক্ষিত, বুদ্ধিজীবী শ্রেণির মধ্যে এ আন্দোলনের কর্মসূচি সীমাবদ্ধ থাকে। ১৯৫২ সালে এ আন্দোলন ব্যাপকতা লাভ করে। তখন শুধু শিক্ষিত শ্রেণি নয়, বরং কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের মধ্যে এর প্রভাব পড়ে। ফলে বুদ্ধিজীবী ও ছাত্রদের নেতৃত্বে গড়ে উঠা ভাষা আন্দোলনে চাকুরিজীবী, মধ্যবিত্ত, কৃষক, শ্রমিক, সাধারণ মানুষ শামিল হয়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এ আন্দোলন ঢাকা শহরসহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। সম্মুখ আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকা রেখেছিলেন শ্রমিক-জনতা। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় ভাষা আন্দোলনে যারা আহত এবং শহীদ হয়েছেন তাদের অধিকাংশ ছিলেন শ্রমিক এবং খেটে খাওয়া ছোটোখাটো চাকুরে। ভাষা শহীদ আব্দুল জব্বার ছিলেন সাধারণ গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষ, আব্দুস সালাম ডাইরেক্টর অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি অফিসের রেকর্ড কিপার পদে চাকরি করতেন, আব্দুল আউয়াল ছিলেন একজন রিকশাচালক, রফিকউদ্দিন ছিলেন একজন ছাপাখানার কর্মচারী। এ থেকে বুঝা যায়, ভাষা আন্দোলনের কোনো একক নেতা ও নায়ক ছিল না। ছাত্র শ্রমিক জনতাই ছিলেন তার প্রকৃত নায়ক। এ পর্যায়ে শুধু ভাষার বৈষম্য নয়, আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। পরবর্তীকালের পূর্ববাংলার প্রতিটি আন্দোলনে প্রেরণা আসে ভাষা আন্দোলন থেকে। ভাষা আন্দোলনের শিক্ষাই আমাদেরকে স্বাধীকার আন্দোলনে দীক্ষিত করে। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ ভাষা আন্দোলনেরই পরিণত ফসল।
ভাষা আন্দোলনে মেহনতি মানুষের অংশ্রগহণের পরিপ্রেক্ষিত
ভাষা আন্দোলনে প্রাণ বিসর্জনকারী শ্রমিক ও মেহনতি মানুষদের একটা বড়ো অংশ বাস করত নীলক্ষেত, পলাশী ব্যারাকসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকটবর্তী অংশগুলোতে। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ভাষা আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র। শ্রমিক এবং সরকারি কর্মচারীরা অচিরেই ভাষা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সহায়ক শক্তিতে পরিণত হয়। ভাষা আন্দোলন উপলক্ষ্যে তাদের মধ্যে যে সচেতনতা জাগ্রত হয় তাই পরবর্তীকালে তাদের নিজেদের দাবি আদায়ের আন্দোলনকে অনুপ্রেরণা যোগায়। ১৯৪৮ সালের এপ্রিল ১০ দিন স্থায়ী সরকারি কর্মচারীদের ধর্মঘট, একই বছর জুলাই মাসে পুলিশ ধর্মঘট, চা বাগান শ্রমিক, রেল শ্রমিক ও কর্মচারীদের ধর্মঘট, ১৯৫০ সালের মার্চ মাসে প্রাথমিক শিক্ষক ধর্মঘট পালিত হয়। ১৯৫০ সালে পূর্ববাংলায় চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী সমিতি গঠিত হয়। এরা পরবর্তী সময়ে সরকারের নিকট যেসব দাবি তুলেছিল তাতে অর্থনৈতিক বিভেদের প্রসঙ্গ ছিল। শুধু সরকারি কর্মচারীরা বা চাকরি প্রত্যাশীরাই নয় নানাভাবে আতঙ্কিত হচ্ছিল ব্যবসায়ী, মধ্যবিত্তশ্রেণি এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ। তাদের সামনে অর্থনৈতিক বিভেদের কারণে ইতোমধ্যেই সৃষ্ট বঞ্চনার বিষয়টিতো ছিল, একই সঙ্গে ভবিষ্যতে ভাষা হারানোর মাধ্যমে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সার্বিক প্রভাবে পড়ার আতঙ্কও তৈরি হয়েছিল। ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলন শুধু শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবী মহলে সীমাবদ্ধ থাকলেও ১৯৫২ সালের আন্দোলন ব্যাপক জনগণের মধ্যে প্রভাব ফেলে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রয়ারি পর্যন্ত পরিস্থিতি রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ২১ ফেব্রয়ারি পুলিশের গুলিবর্ষণের ঘটনায় তা অকার্যকর হয়ে পড়ে। এ সময় শ্রমিক-জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ভাষা আন্দোলনের সফলতা ফিরে আসে।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় ভাষা আন্দোলনে যারা আহত এবং শহীদ হয়েছেন তাদের অধিকাংশ ছিলেন শ্রমিক এবং খেটে খাওয়া ছোটোখাটো চাকুরে। ভাষা শহীদ আব্দুল জব্বার ছিলেন সাধারণ গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষ, আব্দুস সালাম ডাইরেক্টর অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি অফিসের রেকর্ড কিপার পদে চাকরি করতেন, আব্দুল আউয়াল ছিলেন একজন রিকশাচালক, রফিকউদ্দিন ছিলেন একজন ছাপাখানার কর্মচারী। এ থেকে বুঝা যায়, ভাষা আন্দোলনের কোনো একক নেতা ও নায়ক ছিল না। ছাত্র শ্রমিক জনতাই ছিলেন তার প্রকৃত নায়ক। এ পর্যায়ে শুধু ভাষার বৈষম্য নয়, আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। পরবর্তীকালের পূর্ববাংলার প্রতিটি আন্দোলনে প্রেরণা আসে ভাষা আন্দোলন থেকে। ভাষা আন্দোলনের শিক্ষাই আমাদেরকে স্বাধীকার আন্দোলনে দীক্ষিত করে। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ ভাষা আন্দোলনেরই পরিণত ফসল।
রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে পুরো ঢাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে উত্তাপ। ছাত্র-জনতার সম্মিলনে এখানকার পুলিশ লাইনের সদস্যরাও অর্থ সহায়তা দিয়েছিল আন্দোলনে। ১৯৪৮ থেকে শুরু হয়ে ১৯৫২ সাল অবধি জেলা থেকে মহকুমা শহর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল রাষ্ট্রভাষার সংগ্রাম। আর ঢাকার বাইরে একুশের সেই সংগ্রামে ছাত্রদের সঙ্গে শামিল হয়েছিল রাজনৈতিক নেতা, সাহিত্যিক, চিকিৎসক থেকে মেহনতি মানুষ। নারী থেকে পুরুষ কিংবা তরুণ থেকে পরিণত বয়সের মানুষ সম্পৃক্ত হয়েছিলেন মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার আন্দোলনে। তাদের মধ্যে অনেকেই নেতৃত্ব দিয়ে অব্যাহত রেখেছিলেন ভাষা আন্দোলনে। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চের মতোই বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনে উত্তাল হয়েছিল মহকুমা শহর নারায়ণগঞ্জ। হয়ে উঠেছিল মিছিলের শহর। ভাষা আন্দোলনে ঢাকার চেয়ে নারায়ণগঞ্জে ছাত্র-ছাত্রী ও সাধারণ নারী-পুরুষের অংশগ্রহণ ছিল অনেক বেশি। এমনকি গৃহিণীরা অর্থ সাহায্যের মাধ্যমে বেগবান করেছেন ভাষা আন্দোলনকে। অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জের আন্দোলনে ব্যাপকভাবে অংশ নিয়েছিল শ্রমজীবী মানুষ। এই শিল্পাঞ্চলের হাজার হাজার শ্রমিক যোগ দিয়েছে জনসভায় কিংবা মিছিলে। সেসব কর্মসূচি বাস্তবায়নে রাজনৈতিক নেতা শামসুজ্জোহার সমান্তরালে ভূমিকা রেখেছেন শ্রমিক নেতা আলমাস আলী, ফয়েজ আহমদ ও শফি হোসেন।
বন্দরনগরী চট্টগ্রামে ব্যাপক রূপ নিয়েছিল বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন। ভাষার দাবিতে থমথমে অবস্থা বিরাজ করে শহরজুড়ে। মিছিলে-স্লোগানে প্রকম্পিত হয়েছে শহর। লালদীঘি ময়দানের জনসভায় সমবেত হয়েছিল ৫০ হাজারের বেশি মানুষ। সম্পৃক্ত হয়েছিলেন ছাত্র থেকে শুরু করে সাহিত্যকর্মী কিংবা বুদ্ধিজীবী। চট্টগ্রামের আন্দোলনের সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তমদ্দুন মজলিশের আজিজুর রহমান, রেলওয়ে শ্রমিক লীগের নেতা চৌধুরী হারুণ-উর-রশীদ, সাহিত্যিক মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী, আওয়ামী মুসলিম লীগের এম এ আজিজ, জহুর আহমেদ চৌধুরী থেকে সাহিত্যিক গোপাল বিশ্বাস প্রমুখ। সমাবেশে বীর চট্টলার শ্রমিক-জনতার উচ্ছ্বাসে প্রকম্পিত হয়েছিলো লালদীঘি ময়দান।
পাকিস্তানে জন্মের মাত্র তিন মাস পর ১৯৪৭ সালের নভেম্বরে সিলেটে এক ভাষাভিত্তিক বিতর্কে বক্তব্য দিয়েছিলেন সৈয়দ মুজতবা আলী। একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে তীব্র আন্দোলন হয়েছিলেন সিলেটে। সেখানে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অনেক শ্রমিকও অংশগ্রহণ করেছিলো। বায়ান্নর একুশে ফেব্রয়ারি ময়মনসিংহের আন্দোলন হয়ে ওঠে আরও বিধ্বংসী। বন্ধ হয়ে যায় স্কুল-কলেজ, হাট-বাজার, অফিস-আদালত, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ সবকিছু। পরবর্তীতে ময়মনসিংহ থেকে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে মহকুমা শহর জামালপুর, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জে।
ভাষা আন্দোলনের উত্তাপ ছড়িয়েছিল রাজশাহী শহরেও। ১৯৪৮ থেকে ধারাবাহিকভাবে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত এই শহরে আন্দোলন হয়েছে। আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল সেখানকার স্কুল-কলেজগুলো। বায়ান্নর ৪ ফেব্রয়ারি ঢাকার পাশাপাশি রাজশাহীতেও পালিত হয়েছে প্রতিবাদী কর্মসূচি। সেদিনের সভায় বক্তৃতা করেছিলেন পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়া আনোয়ারুল আজিম, মোহসেনা বেগম, মমতাজউদ্দিন আহমদ প্রমুখ। রাষ্ট্রভাষার দাবিতে ২১ ফেব্রয়ারি হরতাল ও ধর্মঘট পালিত হয়েছে এই শহরে। পুলিশি বাধাকে উপেক্ষা করে সকালের মিছিল শেষে বিকেলে ভুবনমোহন পার্কে হয়েছে জনসভা। ছাত্র-শিক্ষকসহ ভাষা সংগ্রামীদের পাশাপাশি শ্রমিক-জনতার মিছিলে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে রাজশাহী শহর। তৎকালীন এমএলএ মাদার বখশসহ কয়েকজন মুসলিম লীগ নেতা সেই জনসভায় বক্তৃতা করেছিলেন। পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে। পরবর্তীতে মাদার বখশ আইনসভা থেকে পদত্যাগ করেন।
১৯৪৮ সাালের মার্চে ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয় বগুড়ায়। হয়েছে প্রতিবাদ সভা থেকে বিক্ষোভ মিছিল। কবি আতাউর রহমানকে সভাপতি করে গঠিত হয়েছিল ভাষা সংগ্রাম কমিটি। ১১ মার্চের একটি জনসভায় বক্তব্য দিয়েছিলেন অধ্যাপক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। আটচল্লিশের পথ ধরে বায়ান্নতে এই শহরে গঠিত হয় সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ। সেই কমিটিতে মজিরউদ্দিন আহমদকে সভাপতি ও গোলাম মহিউদ্দিন সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় গুলিবর্ষণের ঘটনায় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বগুড়া। শহরের আশপাশ থেকে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত ছাত্র-জনতা, কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের মাঝে বিস্তৃত হয় আন্দোলন।
১৯৪৮ সালের মার্চে এডওয়ার্ড কলেজ থেকে পাবনায় ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। বায়ান্নর আন্দোলনেও এই কলেজের শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ২০ ফেব্রয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল করেছিল তারা। সেখানে সাধারণ নারী-পুরুষের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য। সাধারণ শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের অংশগ্রহণ ছিলো উল্লেখ করার মতো। এছাড়া পাবনার ভাষা আন্দোলনে মাহবুবুর রহমান খান ও আমিনুর ইসলাম বাদশাকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে গঠিত হয়েছিল সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। কৃষক-শ্রমিক ও পেশাজীবী মানুষেরা অংশগ্রহণ করেছিলো আন্দোলনে।
রংপুরেও ভাষা আন্দোলন দানা বেধেছিল ১৯৪৮ সালের মার্চে। কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের মুখ্য ভূমিকা ছিল সে আন্দোলনে। মতিউর রহমান, ইদ্রিস লোহানী, ইউনুস লোহানী, ভিখু চৌধুরীদের নেতৃত্বে বিস্তৃত হয় আন্দোলন। এই শহরের বায়ান্নর আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সুফি মোতাহার হোসেন, শাহ তোফাজ্জল হোসেন। ছাত্রদের পাশাপাশি ছাত্রীদের মধ্যে প্রতিবাদী রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন মাসুদা চৌধুরী, ডলি এবং একাত্তরের শহীদ হওয়া মিলি চৌধুরী। কৃষক-শ্রমিকসহ সাধারণ জনগণও অংশগ্রহণ করেছিলো মিছিল-মিটিংয়ে।
বায়ান্নতে ভাষার দাবিতে বিক্ষুব্ধ হয়েছিল দিনাজপুরের ছাত্রসমাজ। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্রদের ওপর গুলি চালানো ঘটনার প্রতিবাদে ২৩ ফেব্রয়ারি বেরিয়েছিল বিশাল এক বিক্ষোভ মিছিল। মিছিলে স্থানীয় পেশাজীবী ও শ্রমিকরাও অংশ নিয়েছিলো সেই মিছিলে। সেই প্রতিবাাদী সভায় বক্তৃতা দিয়েছিলেন মির্জা নুরুল হুদা, গণতান্ত্রিক যুবলীগের দবিরুল ইসলাম ও আবদুল হাফিজ।
১৯৪৮ সালের ফেব্রয়ারি মাসে যশোরে গঠিত হয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। এই পরিষদের নেতৃত্বে আটচল্লিশের ১১ মার্চের কর্মসূচিকে ঘিরে ১৪৪ ধারা জারি থাকলেও তা ভঙ্গ করা হয়। বের করা হয় মিছিল। এক মাইল লম্বা সেই সেই মিছিলে ছাত্র-ছাত্রীদের পাশাপাশি কৃষক, শ্রমিক, মেহনতী জনতাসহ সর্বসাধারণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিলো। পুলিশ গুলি ছুঁড়লেও ঘটনাক্রমে সেই মিছিলের কেউ হতাহত হননি। যশোরের মহকুমা শহর নড়াইল, মাগুরাও ঝিনাইদহে বিস্তৃতি হয়েছিল সেই আন্দোলনের উত্তাপ।
ভাষা আন্দোলনের ঢেউয়ে বায়ান্নতে ফুঁসে উঠেছিল বরিশালও। ব্রজমোহন কলেজকে কেন্দ্র করে বিস্তৃত হয়েছিল এখানকার ভাষার সংগ্রাম। তাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন শামসুল হক। মহিলা-পুরুষ, ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে কৃষক-শ্রমিকসহ সাধারণ মানুষও সম্পৃক্ত হয়েছিলেন এই শহরের ভাষার সংগ্রামে। এভাবেই আটচল্লিশে থেকে বায়ান্ন পর্যন্ত চলমান ভাষা আন্দোলনের ঢেউ আঁছড়ে পড়েছিল খুলনা, ফরিদপুর, নোয়াখালী, ফেনী, চৌমুহনী, মাইজদী, কুমিল্লাসহ পূর্ব বাংলার বিস্তীর্ণ জনপদে। সারাদেশের এ আন্দোলনে শ্রমিক ও সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষেরা অসামান্য অবদান রেখেছেন।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রয়ারি ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়। ওই দিন ছাত্র-ছাত্রীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সরকারের ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার শপথ নেয় এবং ১০ জন করে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে তৎকালীন প্রাদেশিক পরিষদের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করেন। পুলিশ প্রথম অবস্থায় ছাত্রদের গ্রেপ্তার করতে শুরু করে এবং ছত্রভঙ্গ করার জন্য কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ করে। ওই দিন দুপুর ২টা পর্যন্ত এ অবস্থা চলতে থাকে। বিকেল ৩টার পর ছাত্রদের মিছিল প্রাদেশিক পরিষদে যাওয়ার পথে ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে আসতেই পুলিশ গুলি ছোড়ে। সেখানে ৮ জনের মৃত্যুর কথা জানা যায়। তাদের মধ্যে ভাষা শহীদগণের তালিকায় অন্যতম নাম শহীদ আবুল বরকত। তিনি মুর্শিদাবাদ জেলার ভরতপুর থানার বাবলা গ্রামে তাঁর জন্ম। সেখানকার তালিবপুর হাইস্কুল থেকে ১৯৪৫ সালে মেট্রিক এবং বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে ১৯৪৭ সালে আই.এ পাস করেন তিনি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৮ সালে মুর্শিদাবাদ ত্যাগ করে ঢাকায় চলে আসেন। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ২১শে ফেব্রয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের সম্মুখের রাস্তায় ১৪৪ ধারা ভেঙে বিক্ষোভ প্রদর্শনরত ছাত্র-জনতার উপর পুলিশ গুলি চালালে হোস্টেলের ১২ নম্বর শেডের বারান্দায় গুলিবিদ্ধ হন আবুল বরকত। ঢাকা মেডিকেল কলেজের হাসপাতালে জরুরি বিভাগে ভর্তি অবস্থায় রাত আটটার দিকে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। এছাড়াও অন্যতম ভাষাশহীদ রফিক উদ্দিন। ১৯৫২ সালে শহীদ রফিকের বয়স হয়েছিল ২৬ বছর। তাঁর পিতা আবদুল লতিফ ছিলেন ব্যবসায়ী। কলকাতায় ব্যবসা করতেন তিনি। রফিকউদ্দিনের শৈশবের পড়ালেখা শুরু কলকাতার মিত্র ইনস্টিটিউটে। এরপরে মানিকগঞ্জের বায়রা স্কুলে। সিংগাইর উপজেলার পারিল গ্রামে ছিল তাঁদের বাড়ি। ৪৭ এর দেশভাগের পর রফিকউদ্দিনের পিতা ঢাকায় চলে আসেন। বায়রা স্কুল থেকে ১৯৪৯ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন তিনি। তারপর মানিকগঞ্জের দেবেন্দ্রনাথ কলেজে বাণিজ্য বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৫২ সালে তিনি জগন্নাথ কলেজের ছাত্র ছিলেন। পুলিশের লাঠিচার্জ ও কাঁদুনে গ্যাসের কারণে ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ব্যারাকে আশ্রয় নেওয়ার সময় তাঁদের সঙ্গে ছিলেন রফিক। গুলিতে তাঁর মাথার খুলি উড়ে যায়। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে তখনই মারা যান তিনি। মেডিকেল হোস্টেলের ১৭ নম্বর রুমের পূর্বদিকে তার লাশ পড়ে ছিল। প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট ওবায়দুল্লাহর উপস্থিতিতে তাঁর জানাজা পড়ান আজিমপুর মসজিদের ইমাম হাফেজ আবদুল গফুর। সংগোপনে, আত্মীয়-স্বজনের অজ্ঞাতে আজিমপুর কবরস্থানের অসংরক্ষিত এলাকায় দাফন করা হয় শহীদ রফিকের মরদেহ।
এই দুইজন ভাষা শহীদ ছিলেন ছাত্র। বাকী শহীদগণ ছিলেন চাকরিজীবী, শ্রমিক এবং খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষ। তাঁদের অন্যতম ছিলেন শহীদ আবদুস সালাম। তিনি ১৯২৫ সালের ২৭ নভেম্বর ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার লক্ষ্মণপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার নামানুসারে পরবর্তীতে গ্রামের নামকরণ করা হয় সালামনগর। তাঁর পিতার নাম মোহাম্মদ ফাজেল মিয়া ও মাতার নাম দৌলতের নেছা। ফাজেল মিয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং ইরাকের বসরায় কর্মরত ছিলেন। আবদুস সালাম কৃষ্ণরামপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তার শিক্ষাজীবন শুরু করেন। এরপর তৎকালীন মাতুভূঁইয়া কলিমুল্লাহ মাইনর স্কুলে (বর্তমানে মাতুভূঁইয়া উচ্চ বিদ্যালয়) অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর তৎকালীন দাগনভূঞা আতাতুর্ক হাইস্কুল (বর্তমানে আতাতুর্ক মডেল হাই স্কুলে) ভর্তি হন এবং সেখানে দশম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। আর্থিক অনটনে পরবর্তীতে তার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। ভারত বিভাগের পর ১৯৪৭ সালে তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন এবং আজিমপুরে পলাশী ব্যারাক ৩৬বি নং কোয়ার্টারে বসবাস শুরু করেন। এ সময় তিনি তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের ডিরেক্টরেট অব ইন্ডাস্ট্রিজ বিভাগের পিয়ন হিসেবে কাজ শুরু করেন। বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বায়ান্নোর ২১শে ফেব্রয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের সম্মুখের রাস্তায় ১৪৪ ধারা ভেঙে বিক্ষোভে অংশ নেন। পরে ছাত্র-জনতার উপর পুলিশ এলোপাথাড়িভাবে গুলি চালালে অন্যদের সাথে আবদুস সালামও গুলিবিদ্ধ হন। আহত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দেড় মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৯৫২ সালের ৭ এপ্রিল তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে ঢাকার আজিমপুর কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।
বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ২০০০ সালে একুশে পদক (মরণোত্তর) প্রদান করে। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অন্যতম যুদ্ধ জাহাজ ‘বানৌজা সালাম’ তার নামে নামকরণ করা হয়। ফেনী স্টেডিয়ামের নাম পরিবর্তন করে ২০০০ সালে ‘ভাষা শহীদ সালাম স্টেডিয়ামে’ রূপান্তর করা হয়। দাগনভূঞা উপজেলা মিলনায়তনকে ২০০৭ সালে ‘ভাষা শহীদ সালাম মিলনায়তন’ নামকরণ করা হয়। ২০০০ সালে তার নিজ গ্রাম লক্ষ্মণপুর নাম পরিবর্তন করে ‘সালাম নগর’ রাখা হয়। ২০০৮ সালে ‘ভাষাশহীদ আবদুস সালাম গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর’ সালাম নগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০৯ সালে এটি সরকারি নথিভুক্ত হয়। ‘ভাষা শহীদ আবদুস সালাম হল’ নামে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি আবাসিক ছাত্র হল প্রতিষ্ঠা করা হয়। ভাষা শহীদ সালামের নামে দাগনভূঞা উপজেলার সালাম নগরে ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘ভাষা শহীদ সালাম মেমোরিয়াল কলেজ।’
ভাষা আন্দোলনে পেশজীবী শহীদগণের অন্যতম শফিউর রহমান। তিনি ১৯১৮ সালের ২৪ জানুয়ারি ব্রিটিশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার শ্রীরামপুর জনপদের কোন্নগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মাহবুবুর রহমান ছিলেন ঢাকার পোস্ট এন্ড টেলিগ্রাফ অফিসের সুপারিনটেনডেন্ট। তার মাতার নাম কানেতাতুন নেসা। কলকাতা গভর্নমেন্ট কমার্শিয়াল কলেজ হতে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করে শফিউর রহমান চব্বিশ পরগনা সিভিল সাপ্লাই অফিসে কেরানীর চাকরি গ্রহণ করেন। শফিউর রহমান ১৯৪৫ সালে কলকাতার তমিজউদ্দিনের কন্যা আকিলা খাতুনের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। দেশ বিভাগের পর ১৯৪৮ সালে পিতার সঙ্গে ঢাকায় আসেন ও ঢাকা হাইকোর্টে হিসাব রক্ষণ শাখায় কেরানী পদে যোগ দেন।
১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রয়ারি সকাল দশটার দিকে ঢাকার রঘুনাথ দাস লেনের বাসা থেকে সাইকেলে করে অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা হন শফিউর। সকাল সাড়ে দশটার দিকে নওয়াবপুর রোডে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে পূর্বদিনের পুলিশের গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশ পুনরায় গুলিবর্ষণ করে। পুলিশের গুলি শফিউর রহমানের পিঠে এসে লাগে। এতে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। সরকারি এ্যাম্বুলেন্স যোগে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাকে ডা. এ্যালিনসন অপারেশন করেন। ঐদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার সময় তিনি মারা যান। গুলিতে শহীদ শফিউরের কলিজা ছিঁড়ে গিয়েছিল। অপারেশনের সময় সফিউরের মাতা, পিতা, স্ত্রী, মেয়ে শাহনাজ হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন। মৃত্যুর পর পুলিশ আত্মীয়দের কাছে লাশ হস্তান্তর করেনি। ১৪ মার্চ ১৯৫২ তারিখের দৈনিক আজাদে প্রকাশিত সরকারি তথ্যবিবরণী অনুসারে প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট তার জানাজা পড়ান। জানাজায় তার পিতা ও ভাই উপস্থিত ছিলেন। তারপর কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তাকে আজিমপুর কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। তার কবরের পাশেই রয়েছে পূর্বদিন মৃত্যুবরণ করা আবুল বরকতের কবর। ২০০০ সালে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে শফিউর রহমানকে একুশে পদক (মরণোত্তর) প্রদান করা হয়। ২০০৬ সালে ভাষা আন্দোলনে মৃত্যুবরণ করা অন্যান্য পরিবারের পাশাপাশি তার স্ত্রী বেগম আকিলা খাতুনকে আজীবন ভাতা প্রদানের ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ সরকার।
শ্রমিকদের অন্যতম অন্যতম শহীদ ছিলেন আবদুল আউয়াল। তাঁর পিতার নাম আবুল হাশেম। তিনি ১৯২৬ সালের ১১ মার্চ ঢাকার ১৯ নং হাফিজুল্লাহ রোডের কোন এক ছোট্ট বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমান ঢাকা রেল হাসপাতাল কর্মচারী সংলগ্ন এলাকায় সশস্ত্র বাহিনীর মোটর গাড়ীর নীচে চাপা পড়ে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি একজন রিকশা চালক। তাঁর ৬ বছরের একটি কন্যাও ছিল। কন্যার নাম বসিরন।
ভাষা আন্দোলনে শ্রমিকদের মধ্যকার অন্যতম কিশোর শহীদ মুহাম্মদ অহিউল্লাহ। তাঁর পিতার নাম মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান। পিতা হাবিবুর রহমান পেশাগতভাবে রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। আনুমানিক ১৯৪১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন অহিউল্লাহ। তিনি ১৯৫২ সালের বাইশে ফেব্রয়ারি শহীদ হন। ঢাকার নবাবপুর এলাকার বংশাল রোডের মাথায় সশস্ত্র পুলিশের গুলিতে নিহত হন এবং তার লাশ পুলিশ অপহরণ করে।
আবদুল জব্বার ক্যান্সারে আক্রান্ত শাশুড়িকে নিয়ে ১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রয়ারি ঢাকায় আসেন। হাসপাতালে রোগী ভর্তি করে আবদুল জব্বার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ছাত্রদের আবাসস্থল (ছাত্র ব্যারাক) গফরগাঁও নিবাসী হুরমত আলীর ২০/৮ নাম্বার রুমে উঠেন। ২১ ফেব্রয়ারি আন্দোলনরত ছাত্রদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হলে, কি হয়েছে দেখবার জন্য তিনি রুম থেকে বের হয়ে আসেন। তখনই পুলিশ গুলি শুরু করে এবং জব্বার আহত হন। ছাত্ররা তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা জব্বারকে মৃত ঘোষণা করেন।
কার্জন হল এলাকায় মোটর গাড়ি দুর্ঘটনায় একজন শ্রমিক নিহত হন। তাঁর পরিচয় জানা যায়নি। তবে তিনিও তরুণ বয়সের একজন শ্রমিক ছিলেন বলে জানা যায়। ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে যে শোক মিছিল বেরিয়েছিল এই অজ্ঞাতনামা বালক এই মিছিলে অংশ নিয়েছিল। মিছিলটিকে ছত্রভঙ্গ করার জন্য মিছিলের মধ্যখানে তৎকালীন সশস্ত্র বাহিনী ট্রাক চালিয়ে দিলে এই অজ্ঞাতনামা বালকটি সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাঁর লাশটি দ্রুত সরিয়ে ফেলে।
পরিশেষে বলা যায়, ভাষা আন্দোলন আমাদের সাহিত্য, শিল্প-সংস্কৃতি, দেশপ্রেম ও মানবিকতাবোধে নবতর অভিধার আলোকে উজ্জীবিত করেছে। সেই ধারাবাহিকতায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। আমাদের স্বাধীনতা। এই গৌরবোজ্বল ইতিহাসের অন্যতম শরীক কৃষক-শ্রমিক এবং খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষ। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, এই মানুষগুলোই জাতির ইতিহাসের ভিত তৈরিতে মৌলিক ভূমিকা পালন করলেও তাঁর আজও পেছনের কাতারেই রয়ে গেছে। সামাজিকভাবে তাঁদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয় না। তাঁদের মূল্যায়নের জন্য ইনসাফভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থার কোন বিকল্প নেই। সমাজের প্রতিটি স্তরে ইনসাফের নীতি চালু হলেই কেবল পিছিয়ে পড়া এই জনগোষ্ঠীর ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটতে পারে। মহান ভাষা আন্দোলন ফলপ্রসূ করার ত্যাগের ইতিহাসে শ্রমিকদের অবদানকে স্বীকৃতি দিয়ে তাঁদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হোক, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক- গবেষক, কলামিস্ট, মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান, পাঠান পাড়া, (খান বাড়ী) কদমতলী, সদর, সিলেট-৩১১১, মোবাঃ ০১৯৬৩৬৭১৯১৭