সিলেটে শ্রদ্ধা ভালোবাসায় সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের ৯০ তম জন্মবার্ষিকী পালিত

প্রকাশিত: ৯:১৯ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৫, ২০২৪ | আপডেট: ৯:১৯:অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৫, ২০২৪

সিলেটে শ্রদ্ধা ভালোবাসয় বিশ্ব বরেণ্য অর্থনীতিবিদ, বাংলাদেশ সরকারের সাবেক অর্থমন্ত্রী, রাজনীতিবিদ,লেখক গবেষক, ভাষাসৈনিক ও মহান মুক্তিযোদ্ধের অন্যতম সংগঠক প্রয়াত আবুল মাল আবদুল মুহিতের ৯০ তম জন্মবার্ষিকী পালিত হয়েছে।

দিবসটি উপলক্ষে বৃহস্পতিবার সিলেটে মরহুমের সিলেটবাসী ও বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন,ফাতেহা পাঠ ও কবর জিয়ারত করা হয়। বাদ মাগরিব সিলেটে ওলিকুল শিরোমণি হযরত শাহজালাল (রঃ) এর মাজার সংলগ্ন মসজিদে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল আয়োজন করা হয়। এতে মরহুমের রুহের মাগফেরাত কামনা ও দেশের সুখ শান্তি ও কল্যাণ কামনা করে মোনাজাত করা হয়। এসকল একর্মসুচীতে উপস্হিত ছিলেন সিলেট সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও সিলেট জেলা আওয়ামীলীগ সহ সভাপতি আলহাজ্ব আশফাক আহমদ,জেলা আওয়ামীলীগ সহ সভাপতি অধ্যক্ষ সুজাত আলী রফিক,সিলেট মহানগর আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি সিলেট ইউনিটের সেক্রেটারি আব্দুর রহমান জামিল,সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বারের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আব্দুল জব্বার জলিল বাসস’র ব্যুরোচীফ ও সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব সাধারন সম্পাদক মকসুদ আহমদ মকসুদ,সিলেট মহানগর শ্রমিকলীগের সাবেক সাধারন সম্পাদক জাফর চৌধুরী,এ এম এ মুহিতের সাবেক ব্যাক্তিগত কর্মকর্তা কিশোর ভট্রাচার্য জনি,সিলেট মহানগর যুবলীগের সহসভাপতি আব্দুর রব সায়েম,১৯ নং আওয়ামীলীগ নেতা মোঃ মানিক প্রমুখ।
এদিকে বৃহস্পতিবার (২৫ জানুয়ারি) সকালে প্রয়াত আবুল মাল আবদুল মুহিতের ৯০ তম জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক ও বিসিবি পরিচালক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল এমপি।
বৃহস্পতিবার সকালে তিনি ঢাকা থেকে সিলেটে পৌছে সরাসরি সিলেট নগরীর রায়নগরে এ এম এ মুহিতের কবরে যান,সেখানে তিনি মরহুমের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে কবরের পাশে ফাতেহা পাঠ ও কবর জিয়ারত করেন। এসময় তিনি মহান আল্লাহর কাছে আবুল মাল আবদুল মুহিতের রুহের মাগফেরাত ও দেশের সুখ শান্তি ও কল্যাণ কামনা করে মোনাজাত করেন।
এসময় তারসাথে ছিলেন সিলেট জেলা ক্রীড়া সংস্হার সাধারন সম্পাদক ও বাফুফে পরিচালক মাহি উদ্দিন আহমদ সেলিম সিআইপি প্রমুখ।
আবুল মাল আবদুল মুহিত ১৯৩৪ সালের ২৫শে জানুয়ারি সিলেট শহরের ধোপাদিঘির পাড়ে পৈতৃক বাড়িতে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একাধারে অর্থনীতিবিদ, কূটনীতিক, ভাষাসৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা। পাকিস্তান আন্দোলনের অন্যতম নেতা,তৎকালীন সিলেট জেলা মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা অ্যাডভোকেট আবু আহমদ আব্দুল হাফিজের তৃতীয় সন্তান তিনি। তার মা সৈয়দা শাহার বানু চৌধুরীও বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন।
১৯৫১ সালে সিলেট এমসি কলেজ থেকে আইএ পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সারা প্রদেশের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেন অর্থমন্ত্রী মুহিত। এরপর ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম এবং ১৯৫৫ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি।
আবুল মাল আব্দুল মুহিত চাকুরিরত অবস্থায় অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নসহ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমপিএ ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে (সিএসপি)যোগদানের পর তৎকালীন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার, পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক সরকার এবং স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন তিনি। ১৯৭২ সালে তিনি পরিকল্পনা সচিব এবং ১৯৭৭ সালে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বহিঃসম্পদ বিভাগে সচিব পদে নিযুক্ত হন।
অর্থমন্ত্রী মুহিত পাকিস্তান পরিকল্পনা কমিশনের প্রধান ও উপসচিব থাকাকালে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যে বৈষম্য ছিল, তার ওপর ১৯৬৬ সালে একটি প্রতিবেদন প্রণয়ন করেন। সংবিধানের বাধ্যবাধকতা পালনে পাকিস্তান ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে এটিই ছিল এ বিষয়ের ওপর প্রথম প্রতিবেদন। ওয়াশিংটন দূতাবাসের প্রথম কূটনীতিবিদ হিসাবে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১এর জুন মাসে পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে একজন সংগঠকের ভূমিকা পাোলন করেন।
আবুল মাল আবদুল মুহিত বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সলিমুল্লাহ হল ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। সক্রিয় ছিলেন ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনেও।
১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস-এ (সিএসপি) যোগ দেয়ার পর মুহিত তৎকালীন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার, পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক সরকার এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭২ সালে তিনি বাংলাদেশের পরিকল্পনা সচিব নিযুক্ত হন।
তবে এই দায়িত্ব গ্রহণ না করে তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পরামর্শ করে ওয়াশিংটন দূতাবাসে ইকোনোমিক মিনিস্টারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭৪ সালে তিনি এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংকে নির্বাহী পরিচালক পদে নিযুক্ত হন। ১৯৭৭ সালে তিনি অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বহিঃসম্পদ বিভাগে সচিব পদে নিযুক্ত হন। ১৯৮১ সালে চাকরির ২৫ বছর পূর্তিকালে মাত্র ৪৭ বছর বয়সে তিনি স্বেচ্ছায় সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেন।
আবদুল মুহিত পাকিস্তান পরিকল্পনা কমিশনের চিফ ও উপ-সচিব থাকাকালে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্যের ওপর ১৯৬৬ সালে একটি প্রতিবেদন প্রণয়ন করেন। পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে এটিই ছিল এই বিষয়ে প্রথম প্রতিবেদন।
ওয়াশিংটন দূতাবাসের তিনি প্রথম কূটনীতিবিদ, যিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ১৯৭১ এর জুন মাসে পাকিস্তানের পক্ষ পরিত্যাগ করে বাংলাদেশের পক্ষে আনুগত্য প্রদর্শন করেন।
অর্থনৈতিক কূটনীতিতে আবুল মাল আবদুল মুহিতের বিশেষ খ্যাতি আছে। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক ও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থায় তিনি ছিলেন একজন সুপরিচিত ও সুনামধন্য ব্যক্তিত্ব। ১৯৮১ সালে চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে তিনি অর্থনীতি ও উন্নয়ন পরামর্শক হিসেবে ফোর্ড ফাউন্ডেশন ও ইফাদে কাজ শুরু করেন।
১৯৮২ সালের মার্চ থেকে ১৯৮৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে সে পদথেকে তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন। পরবর্তীকালে তিনি বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরামর্শক হিসাবে কাজ করেন। ১৯৮৪ ও ১৯৮৫ সালে তিনি প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের উড্রো উইলসন স্কুলে ভিজিটিং ফেলো ছিলেন।
আবুল মাল আবদুল মুহিতের রচিত মুক্তিযুদ্ধ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ইতিহাস, জনপ্রশাসন, রাজনৈতিক সমস্যা সহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় তার ৩০টি বই প্রকাশিত হয়েছে।
২০১৭ সালে প্রকাশিত হয় ‘স্মৃতিময় কর্মজীবন’ নামে তার ষাট বছরের বিচিত্র কর্মজীবনের স্মৃতিকথা। বইটি উৎসর্গ করেছিলেন তার সহধর্মিনী সৈয়দা সাবিয়া মুহিতকে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে এবং জাতীয় পর্যায়ে গৌরবোজ্জ্বল অবদানের জন্যে ২০১৬ সালে  আবুল  মাল  আবদুল মুহিতকে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করেন বাংলাদেশ সরকার।
আবুল মাল আব্দুল মুহিত বাংলাদেশের পরিবেশ আন্দোলনের একজন পথিকৃৎ। তিনি বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এবং এর আগের সংগঠন ‘পরশ’-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। তার স্ত্রী সৈয়দা সাবিয়া মুহিত একজন বিশিষ্ট ডিজাইনার। মুহিত-সাবিয়া দম্পতির তিন সন্তানের মধ্যে প্রথম কন্যা বেগম সামিনা মুহিত একজন ব্যাংকার এবং মুদ্রানীতি ও আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিউইয়র্কে কর্মরত। তাদের বড় ছেলে সাহেদ মুহিত স্থপতি ও তথ্যপ্রযুক্তিবিদ হিসেবে ঢাকায় কর্মরত। ছোট ছেলে সামির মুহিত যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে শিক্ষকতা করছেন।
আবুল মাল আবদুল মুহিত ২০০১ সালে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগে যোগদান করে নৌকা প্রতীক নিয়ে সিলেট-১ আসন থেকে প্রথমবারের মতো নির্বাচনে অংশনিয়ে পরাজিত হন। পরে তিনি আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য মনোনীত হয়ে দলীয় কর্মকাণ্ডকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপুর্ন ভূমিকা পালন করেন। পরে ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগের প্রার্থাী হয়ে সিলেট-১ আসন থেকে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহন করেন। ২০১৩ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি পুনঃবার সিলেট-১ আসন থেকে দ্বিতীয়বারের মতো জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত টানা ১০ বছর ও এরআগে ২ বছর মিলিয়ে এ এম এ মুহিত বাংলাদেশ সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে মোট ১২ টি জাতীয় বাজেট ঘোষনা করেন। এরআগে বাংলাদেশে এমন ইতিহাস রচনা আর কোন অর্থমন্ত্রী করতে পারেননি। যারফলে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্হা উন্নতির এক অনন্য উচ্চতায় পৌছাতে তিনি সক্ষম হন। আবুল আবদুল মুহিত ২০১৮ সালে দশম জাতীয় সংসদের শেষ অধিবেশনে মহান জাতীয় সংসদে দাড়িয়ে তাঁর শেষ বক্তব্যে সরকারের মন্ত্রী,এমপি ও দলের দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় অবসরগ্রহণ করেন,যাহা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এরআগে তারমতো এভাবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে অবসরগ্রহণ করা ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত বলে মন্তব্য সচেতন মহলের।
অবসর নিয়েও তিনি বসে থাকেননি,জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানে জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ‘মুজিববর্ষ’ উদযাপন জাতীয় কমিটি ও জতীয় উন্নয়নে গৃহিত বিভিন্ন কার্যক্রমে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
আবুল মাল আবদুল মুহিত ২০২২ সালের ৩০ এপ্রিল শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ৫৬ মিনিটে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সিলেট নগরীর রায়নগরে মুহিত পরিবারের পারিবারিক কবরস্থানে মা-বাবার কবরের পাশে বিশ্যবরেণ্য অর্থনীতিবিদ ও জাতির এ শ্রেষ্ঠ সন্তানকে চির সমাহিত করা হয়।
এদিকে এ এম এ মহিতের ৯০ তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সিলেট ও ঢাকায় নানা কর্মসুচীর আয়োজন করা হয়।