SylhetNewsWorld | চলছেন আশিকান ফুলতলীতে - SylhetNewsWorld
সর্বশেষ

চলছেন আশিকান ফুলতলীতে

  |  ১২:৪২, জানুয়ারি ১৫, ২০২২

মাওলানা সুন্নাতুল রহমান এর ফেসবুক

 

চলছেন আশিকান ফুলতলীতে-
এ যেন এক অঘোষিত গণমিছিল।গন্তব্যে পৌঁছাতে কি যে প্রতিযোগিতা।নির্ঘুম রাত,কাক ডাকা ভোরের অপেক্ষা।পাখির কলরবে, স্নিগ্ধ বাতাসে ভরপুর আজকের সকাল।একটি ফুরফুরে ভাব।মিষ্ট রুদ্রের সাথে শ্যামল বাতাসের সুন্দর সামঞ্জস্য।অন্যদিনের ন্যায় নেই শিতল বায়ূ প্রবাহ।বাহ! কি চমৎকার সকাল।
আজ প্রাকৃতি যেন কি এক অনুকূলে সাজিয়েছে সব? এক অদৃশ্য হাতের পরষে সবকিছুতেই নতুনত্বের ছোঁয়া।সেই ছোঁয়ার সংস্পর্শ পেতে মরিয়া সকলে।সারি সারি গাড়ির বহর, বাহারি রংয়ের ভ্যানার, ফেস্টুন আর মায়াবী কন্ঠের হামদ-না’তের ধ্বনিতে মূখরিত চতুরপাশ।অবাল বৃদ্ধ বনিতার উঁকি মারা দৃষ্টি মেইন রোডের দিকে।উচ্চারিত হচ্ছে,ও! আজ ১৫ জানুয়ারী, আশিকজনের নয়ন মনি ছাহেব কিবলাহ ফুলতলীর ইসালে সাওয়াব মাহফিল।বালাই হাওর পরিপূর্ণ হবে আজ নবী প্রেমীকদের পদচারণায়।থাকবেনা তিল ধারণের ঠাঁই।বাদ মাগরীব লা ইলাহার ধ্বনিতে মুখরিত হবে আকাশ বাতাস॥আবেগী কণ্ঠের সালাতো সালামের আকর্ষণে কিছু সময়ের জন্য ভক্তকুলকে নিয়ে যাবে সোনার মদীনা পানে। লক্ষ জনতার ঋদয়ের স্পন্দন, বিধবা,এতিম,অসহায় বনি আদমদের অভিবাবক হযরত আল্লামা বড় সাহেব কিবলাহর মোনাজাতে বিগলিত ঋদয়ে গড়িয়ে পড়বে লক্ষ লক্ষ অশ্রুবারণ।সম্ভাবনা থাকা স্বত্তেও সুযোগ কাজে লাগাতে পারিনি বলে অংশ গ্রহন করা হলোনা অধমের।দায়িত্য আনজাম দিতে এক সপ্তাহ ব্যবধানে হাজিরা দিতে হলো কর্মস্থলে।
বালাই হাওরঃ
বালাই হাওর একটি নাম, একটি ইতিহাস, একটি অধ্যায়।এই হাওরকে ঘীরে আজকের যত সব আয়োজন।প্রয়োজনে কিছু লিখনি।এ বালাই হাওরের পাদদেশের ফুল শয্যার মতো সাজানো গোছানো ফুলতলী নামক একটি গ্রাম। সুফী দরবেশ হযরত শাহ জালাল ইয়ামনি (রহঃ) এর সফর সঙ্গী ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম শাহ কামাল (রহঃ) এর বংশধরদের অবস্থান এখানে। শত বৎসর পূর্বে এক পূন্যময়ী সন্তানের জনক জননী হন তখনকার
প্রখ্যাত আলিমে দ্বীন মুফতি মাওলানা আব্দুল মজিদ চৌধুরী ও মরহুমা মোছাম্মত মাছুরা বিবি।তাদের কোল আলোকিত করে ১৯১৩ সালে ১৩২১ বাংলার এক সুবহে সাদিকে শুভাগমন করেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত অলীয়ে কামিল পীর ও বীর শামসুল উলামা আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী (রঃ)।যাকে নিয়ে বালাই হাওরের আজকের আয়োজন।এই প্রস্তুতি ও অপেক্ষা অনেক দিনের।সংশ্লিষ্ট সকলকে কৃতজ্ঞতা ও সশ্রদ্ধ অভিনন্দন।দূরদর্শনের মাধ্যমে সাথে আছি আমি আমরা।

এক নজরে ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ( রঃ)ঃ-
(কপি পেষ্ট ফেইসবুক হতে)
আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী (রঃ)। যাকে সবাই ফুলতলী ছাহেব ক্বিবলাহ বলে চিনে জানে ডাকে। সিলেট জেলার জকিগঞ্জের ফুলতলী নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ। পিতা মুফতি আব্দুল মজিদ চৌধুরী (রঃ) আর মাতা মরহুমা মোছাম্মত মাছুরা বিবি চোধুরী।তিনি ছিলেন হযরত শাহ জালাল ইয়ামনি (রহঃ) এর সফর সঙ্গী ৩৬০ আউলিয়ার মধ্যে অন্যতম শাহ কামাল (রহঃ) এর বংশধর।

শিক্ষা জীবনঃ-
চাচাতো ভাই মাওলানা ফতির আলী (রহঃ) এর মাধ্যমে ফুলতলীতে লেখাপড়ার সূচনা।কৃতিত্বের সাথে ফুলতলী মাদ্রাসায় প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তের সাথে সাথে কারী সৈয়দ আলী সাহেবের নিকট কেরাত শিক্ষা। মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য ভর্তি হন হাইলাকান্দি রাঙ্গাউটি মাদ্রাসায়। সেখান থেকে ১৩৩৬ সালে মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপন করেন। ১৩৩৮ সালে বদরপুর সিনিয়র মাদ্রাসায় ভর্তি হন। আর এখান থেকে তিনি উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সমাপন করেন। উচ্চশিক্ষা অর্জনের লক্ষ্যে তিনি ভর্তি হন ভারতের মাদ্রাসায়ে আলিয়া রামপুরে। তারপর ইলমে হাদিসের শিক্ষা অর্জনের জন্য মাতলাউল উলূম মাদ্রাসায় ভর্তি হন।প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করে ১৩৫৫সালে হাদিসের সনদ লাভ করেন। তিনি ইলমে কেরাত শিক্ষার জন্য প্রথমে শাহ ইয়াকুব বদরপুরী (রহঃ) এর কাছে শিক্ষা নেন। তারপর উনার আদেশে আব্দুর রউফ করমপুরী (রহঃ) এর কাছে শিক্ষা লাভ করেন। অবশেষে ইলমে কেরাতের শিক্ষার জন্য ১৯৪৪ সালে ১৩৫১ বাংলায় মক্কা শরীফ গমন করেন। সেখানে রইছুল কুররা হযরত আহমদ হিজাযী মক্কী (রহঃ) এর কাছে ২বছর যাবত কেরাত শিক্ষা করেন। ১৯৪৫ সালে ১৩৫৩ বাংলায় তিনি কেরাতের সনদ লাভ করেন।

আধ্যাত্মিক ধীক্ষাঃ
ছোট বেলায় তিনি পিতাকে হারিয়ে এতিম হয়ে পড়েন। তখন যিনি স্নেহের হাত বাড়িয়ে দেন তিনি শাহ ইয়াকুব বদরপুরী (রহঃ)। শাহ ছাব ছিলেন জৌনপুরী ছিলছিলার একজন পীর। আল্লামা ফুলতলী ১৩৩৯ বাংলায় ১৮ বছর বয়সে শাহ ইয়াকুব বদরপুরী (রহঃ) এর কাছে তরিকতের বয়াত গ্রহণ করেন। তাছাড়া বদরপুরী (রহঃ) এর ইযাজত ক্রমে তিনি ভারতের গোলাম মুহিউদ্দীন (রহঃ) এর কাছেও বয়াত গ্রহণ করেন। গোলাম মুহিউদ্দীন (রহঃ) এর কাছ থেকেই দালাইলুল খায়রাতের ইজাযত নেন। আল্লামা ফুলতলী ছিলেন পাঁচ তরিকার বুজুর্গ। যথা- চিশতিয়া, কাদিরিয়া,নকশবন্দিয়া, মজাদ্দিদিয়া,মুহাম্মদিয়া।

কর্ম জীবনঃ-
১৯৪৬ সালে বদপুর আলিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবনের সূচনা হয়। ১৯৫০ সাল পর্যন্ত সেখানে শিক্ষকতা করেন। তারপর গাছ বাড়ী আলিয়া মাদ্রাসায় ৬ বছর শিক্ষকতা সাথে ভাইস প্রিন্সিপাল ও পরে ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপালের দায়িত্য আনজাম করেন। পরবরতিতে সুদীর্ঘকাল সৎপুর আলিয়া মাদ্রাসায় এবং ইছামতি আলিয়া মাদ্রাসায় কামিল জামাতে ইলমে হাদীসের দারস প্রদান করেন। ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত ফুলতলী আলিয়া মাদ্রাসায় সপ্তাহে দুই দিন বুখারী শরীফের দরস দিতেন।

দারুল কিরাত/খেদমতে খালক-
আল্লামা আব্দুন নূর গড়কাপনী (রহঃ) অনুরোধে তিনি প্রথম “দারুল কেরাত” ভারতের আদম খাকী নামক স্থানে শুরু করেন। প্রতি বৃহঃবার সেখানে কেরাত শিক্ষা দিতেন। ১৯৫০ সাল থেকে নিজ বাড়ীতে কেরাত শিক্ষা শুরু করেন। বর্তমানে তা প্রায় দেড় সহস্রাধিক শাখায় পরিণত হয়েছে।

১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ” লতিফিয়া এতিম খানা ফুলতলী”। যেখানে আজ ২০০০ এতিম শিশু লালিত পালিত হচ্ছে।১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন “হযরত শাহজালাল দারুচ্ছুন্নাহ ইয়াকুবিয়া কামিল মাদ্রাসা”। ২০০২ সালে “লতিফিয়া কমপ্লেক্স” প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ” বাংলাদেশ আনজুমানে মাদারিছে আরাবিয়া”। ১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ” বাংলাদেশ আনজুমানে আল ইসলাহ”। ১৯৮০ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারী প্রতিষ্ঠা করেন “বাংলাদেশ আনজুমানে তালামীযে ইসলামিয়া”। ২০০৬সালে প্রতিষ্ঠা করেন “ইয়াকুবিয়া হিফযুল কুরআন বোর্ড”। ২২টি উপজেলার ৩১২টি মাদ্রাসা এ বোর্ডের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এছাড়াও তিনি প্রতিষ্ঠা করেন “লতিফিয়া কারী সোসাইটি” এবং ” মুসলিম হ্যান্ডস বাংলাদেশ”।

পারিবারিক জীবনঃ-
তিনি ১৩৪৫সালে শাহ ইয়াকুব বদরপুরী (রহঃ) এর তৃতীয়া কন্যা মরহুমা মোছাম্মত খাদিজা বেগমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। পরবর্তীতে মরহুম আব্দুর রশিদ খানের কন্যা নেহারুন নেছার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর ৭ ছেলে ও ৩ মেয়ে।সকলেই সর্বস্ব উজাড় করে দ্বীন ইসলামের খাদীম।

লিখনিঃ-
তাঁর লেখালেখি উর্দু ভাষায় হলে বাংলায় অনুদিত,তথ্য ও হিকমত পূর্ণ। তিনি পবিত্র কোরআনের প্রথম দু’পারা তাফসীর করেন। যে কিতাবের নাম “আততানভীর আলাত তাফসীর”। রাসূল পাক (সাঃ) এর পবিত্র জীবনী বিষয়ে লেখা “মুন্তাখাবুস সিয়র” একটি অনন্য বই। এছাড়াও তিনি লিখেছেন “আনওয়ারুস ছালিকীন”, “শাজরায়ে তাইয়্যিবাহ”, “নেক আমল”। পবিত্র জুম্মাবারে মসজিদে খুবতার জন্য লিখেন “আল খুতবাতুল ইয়াকুবিয়া”। রমজানে “দারুল কেরাতে” পড়ানোর জন্য লিখেন তাজবিদ বিষয়ে ” আল কাউলুছ ছাদীদ”। আর অসাধারণ এবং মুগ্ধতায় ভরপুর তাঁর লেখা কছিদা বা উর্দু কাব্যগ্রন্থ “নালায়ে কলন্দর”। যেটি আজ দিকে দিকে শিল্পিদের কন্ঠে প্রতিধ্বনিত হয়।

ইন্তেকালঃ-
তিনি ২০০৮ সালের ১৬ জানুয়ারি ৬মুহররম ১৪২৯ হিজরী ৩মাঘ ১৪১৪ বাংলা বুধবার রাত ২টার সময় সিলেটের সুবহানী ঘাটস্থ নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন।

মুহাম্মদ ছুন্নাতুর রহমান ,নিউইয়র্ক।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ