বাংলাদেশ বিশ্বকাপে না খেললেও বিশ্বকাপ এ দেশের মানুষের হৃদয়ের এক বড় উৎসব ।সমর্থকদের খুনসুটি, বন্ধুদের আড্ডা, বড় পর্দায় খেলা দেখা, পতাকা আর জার্সির রঙে রঙিন হয়ে ওঠা চার পাশ পক্ষে-বিপক্ষের তর্কতর্কিও বাড়তি আনন্দ যোগ করে। এ সময়টায় অনেকেই ভিন্ন ভিন্ন দল সাপোর্ট করে থাকেন। আর সে অনুযায়ী বাসা-বাড়ি, গাছ বা ছাদে পছন্দের দেশের পতাকা টাঙিয়ে থাকেন। পছন্দের দলের প্রতি সমর্থন জানাতে কোনো কমতি থাকে না। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে ড্রইংরুম, সবখানেই জমে ওঠে ফুটবল আর প্রিয় দল নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ। সবার প্রশ্ন থাকে কোন দল বিশ্বকাপে ফাইনালে খেলবে। ২০২৬ বিশ্বকাপে অনেকগুলা দলকে হারিয়ে অবশেষে আর্জেন্টিনা এবং স্পেন ফাইনালে উঠলো । আর্জেন্টিনা এবং স্পেনের মধ্যে ফাইনাল ম্যাচের দিন চলে আসলো সকাল থেকে একটি আনন্দ উৎসবে জাগল আজকে ফাইনাল খেলা কোথায় দেখা হবে সবার মধ্যে ছিল আলোচনা
নির্ধারিত হলো আমাদের বাসায় সবাই চলে আসার জন্য ইফতি সবাইকে নিমন্ত্রণ জানালেন।
খেলা দেখতে দর্শক প্রচুর হবেন তাই সকাল থেকে ড্রয়িং রুম থেকে সোফা বাইর করা হল জায়গা বড় করার জন্য ।ফাইনাল খেলা দেখার মূল আকর্ষণ ছিলেন ভাতিজা রুহেল , প্রবাস থেকে দীর্ঘদিন পরে দেশে এসেছেন এবং আমাদের বাসায় খেলা দেখবেন ।
বিশাল প্রজেক্টর রেডি করা হলো খেলা শুরু হওয়ার আগে ঈদের আনন্দ বইলো রাত দশটা যথারীতি সবাই এক এক করে চলে আসলেন আমাদের বাসায় ।ভাতিজা পারভেজ , হান্নান ,ভাগনা আলামিন ,রাহিম সবাই মুখরোচক মজাদার খাবার নিয়ে আসলেন খেলা দেখার ফাঁকে খাওয়ার জন্য । দর্শক ধারন করার ক্ষমতা বাইরে চলে গেল ড্রইং রুমের । খেলা শুরু হওয়ার আগে ম্যাক্সিমাম দর্শক ছিলেন স্পেনের সমর্থক । যদিও ওরা ব্রাজিল হারার পর ছিটকে পড়েছেন তাই বিশ্বকাপে ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারাতে হবে সেই জন্য তর্ক-বিতর্ক শুরু হল খেলা দেখতে আমাদের বাসায় চলে আসলেন আমাদের পরিবারের সবচেয়ে বড় ভাই তোতা ভাই ও আজারি চাচা । যদিও খেলা দেখতে আনন্দ লাগছে কিন্তু আমি সোহেল আর সাবাহ আমরা খুব কষ্ট করে খেলা দেখেছি প্রজেক্টর থেকে খেলা দেখার দুরত্ব একফুট হবে । মনে হয়েছে আসমানের দিকে তাকাচ্চি । রাত ১ টা শুরু হলো খেলা ।শুরু হওয়ার প্রথম থেকে নজর কেড়েছে স্পেনের খেলার গতি। বল পেলেই দ্রুততার সঙ্গে আক্রমণে উঠছিল তারা। তখন হান্নান , ভাগনা আলামিন , রাহিম , নোমান,আর ইফতি এমন ভাবে চিল্লাচিল্লি করতেছে মনে হচ্ছে যেন এখনই গোল দিয়ে দিবে স্পেন। স্পেনের সেই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে বার বার সমস্যায় পড়েছে আর্জেন্টিনা। প্রথমার্ধে দাঁড়াতে পারেনি তারা। প্রথম ২০ মিনিটে মাত্র দু’বার বল পায়ে ঠেকিয়েছিলেন মেসি তখন পাপলু , জুয়েল, আব্দুর রহমান, আবুল হাসনাত ইশমাম , ফাহিম, সাবাহ , সাইম আশাবাদী ছিলেন যে এবার আর্জেন্টিনা গোল দিয়ে দিবে কিন্তু গোল হল না।

স্পেনের খেলার মধ্যে শুরু থেকেই একটা টার্গেট ছিল পাস খেলে প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করে দেওয়া। এই কাজে মুখ্য ভূমিকা নেন রদ্রি। সঙ্গে বা প্রান্তে সাহায্য করেন আলেক্স বায়েনা এবং মার্ক কুকুয়েরা। ডান প্রান্তে থাকেন লেমিনে ইয়ামাল। আর্জেন্টিনার উচিত ছিল কুকুরেয়া এবং ইয়ামালকে বল দেওয়ার রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া। সেই কাজ করতেই পারল না তারা। বল পেয়ে বার বার ইয়ামাল এবং কুকুরেয়া উঠে এলেন।
গোটা ম্যাচে প্রায় অদৃশ্য থাকার পর, নির্ধারিত সময়ের শেষের দিকে হঠাৎ যেন প্রাণ ফিরে পান মেসি তখন সোহেল ,জুয়েল , ইফতির মামা আবু বকর ,আব্দুর রহমান, ইশমাম আবুল হাসনাত , ফাহিম , সাবাহ, সাইম মহা খুশি হন কিন্তু না তাদের উৎসব সফল করতে কাজে লাগাতে পারল না আর্জেন্টিনা।
খেলা দেখার ফাকে আজারি চাচা বাসার বাহিরে গিয়ে এক এক করে ১৫ টির মতো সিগারেট ভক্ষণ করলেন । সবার তখন ফাউল তাত্বিক কে নিয়ে হাসছিলেন । আবার খেলা জমলো ফের্নান্দেজ় প্রথম হলুদ কার্ড হজম করেন ।রদ্রির কাছে বল হারানোর পর রেফারির কাছে ফাউলের আবেদন করেন। রেফারি পাত্তা না দেওয়ায় হাত ছুড়ে প্রতিবাদ করেন, যে কারণে হলুদ কার্ড দেখতে হয়। বিরতির সময়ের পর ফের্নান্দেজ় এবং পাউ কুবারসির মাঝে বল এসেছিল। কুবারসিই সেই বলের নিয়ন্ত্রণ নিতে গিয়েছিলেন। ফের্নান্দেজ় দৌড়ে গিয়ে বলের নিয়ন্ত্রণ নিতে গিয়ে ফাউল করেন। রেফারি দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখাতে দ্বিধা করেননি। অবশেষে লাল কার্ড ।
ওখানেই আর্জেন্টিনার জয়ের সম্ভাবনা অনেকাংশে শেষ হয়ে যায় ভেবেই রুহেল , পারভেজ , হান্নান , আল-আমিন ,রুমান, রাহিম ,ইফতি ,সাদিক , তাহের ,নাঈম, গলা ছেড়ে উৎসবের সাথে আনন্দ করে । স্পেন তখন
গোল দিতে মরিয়া হয়ে ওঠে অবশেষে মাহেন্দ্রক্ষণ মুহূর্ত এল ১১৬ মিনিটে। নিকো উইলিয়ামসের হেড থেকে ফেরান তোরেসের শট এবং গোল তখন আমি গোল দিলাইছেরে ,দিলাইছেরে ,দিলাইছেরে, বলার সময় সুহেল এর চোখ ঝাপসা দেখাচ্ছিল আর ইফতির মামা আবু বকরের চোখ দিয়ে টলমল করে পানি পরছিল। বিশ্বকাপ ফুটবলে ফাইনাল ম্যাচে রানার্স আপ দল আর্জেন্টিনার জন্য রইল শুভকামনা আর চ্যাম্পিয়ন দল স্পেনের জন্য রইলো শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

তখন রুহেল , হান্নান , আল-আমিন রাহিম ,মিজান, ইফতি ,সাদিক , নাঈম, তাহের গলা ছেড়ে উৎসবের সাথে আনন্দ করেন। স্পেনের কাছে ০-১ হেরে গেল আর্জেন্টিনা।
পরিশেষে যে কথাটি বলা বাহুল্য বিশ্ব কাপ ফুটবল ম্যাচ দেখা নিয়ে যুক্তিতর্ক, হাসিঠাট্টা অনেক হয়েছে, তবে তা কখনোই তর্কযুদ্ধ কিংবা মনোমালিন্যের পর্যায়ে যায়নি। সময় জীবন থেকে হারিয়ে যায় তবে শিক্ষণীয় ব্যাপার গুলো মনে গেঁথে যায়। এই যে বিশ্ব কাপ ফুটবলের সুবাদে সবার মনোভাব, সহমর্মিতা, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ আর ধৈর্যধারণের শিক্ষা সবাই—একসঙ্গে না হলে এত সুন্দরভাবে হয়তো খেলা দেখা হতো না। তাই স্মৃতির আঙ্গিনায় বহমান থাকবে এবারের বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলা।
লেখক: সাংবাদিক।
